ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে সমরেশ গজগজ করতে থাকেন। পাঁচটার মধ্যে ফেরার কথা ঋকের। সাড়ে পাঁচটা বাজে অথচ ধারে কাছে টিকি পাওয়া যাচ্ছে না ছেলের। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় চলে আসেন তিনি। গলির শেষ মাথাটা অবধি দেখা যায় এখান থেকে। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে অথচ ছেলের দেখা নেই। আজ আইপিএলের খেলা আছে ইডেনে। প্রায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দুটো টিকিট জোগাড় করেছেন সমরেশ। বাবা ছেলের ক্রিকেট দেখার শখ সাংঘাতিক। এখনই বেরোতে না পারলে ঠিকমতো গুছিয়ে বসা যাবে না। ভিড় তো আছেই তার ওপর জ্যাম। এসব ভাবতে ভাবতে অস্থির হয়ে ওঠেন নিরুপায় বাবা।
অকস্মাৎ দরজা ঠেলে ভিতরে ঢোকে ঋক। সমরেশ চেঁচিয়ে ওঠেন, 'কিরকম আক্কেল তোর ? কটা বাজে খেয়াল আছে ? এখনই বেরোতে না পারলে.......'। পুরোটা শেষ করতে দেয় না ঋক। হাত তুলে থামায় বাবাকে। নিচুস্বরে বলে, 'কোচিং থেকে বেরিয়ে দেখলাম পাশের পাড়ায় ব্লাড ক্যাম্প হচ্ছে। দিয়ে আসতেই যা একটু দেরি হল'। মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেলেন সমরেশ। ঘুরে তাকালেন দেওয়ালে ঝোলানো একটা বাঁধানো ছবির দিকে। বছর দুয়েক আগের স্মৃতি এখনো দগদগে ঘায়ের মতো দুজনের বুকেই জীবন্ত। মর্মান্তিক পথ দুর্ঘটনার ভয়াল কোপে স্নেহলতা আজ দুজনের থেকে বিচ্ছিন্না। শুধুমাত্র রক্তের অভাবে সেদিন ফেরানো যায়নি তাঁকে। ছবির কাঁচে ঋকের ছায়া পড়ায় সম্বিৎ ফেরে সমরেশের। কোমল কণ্ঠে বলেন, 'যা, মুখ হাত ধুয়ে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। সময়মতো পৌঁছতে হবে তো'।
বাবার হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে দেয় ঋক । কনুইয়ের ভাঁজে একটা গোলাকার ব্যান্ডেড চোখে পড়ে। তৎক্ষণাৎ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কি ব্যাপার ! চোট লাগল কি করে তোমার' ? সমরেশ কোনোমতে কম্পিতস্বরে বলেন, 'ও কিছু না, অফিস যাওয়ার আগে আমিও একবার ওই ক্যাম্পে.......' । নিজেকে আর সামলাতে পারে না ঋক । এক লহমায় জড়িয়ে ধরে সমরেশকে। অন্তর্নিহিত গ্লানি জল হয়ে বেরিয়ে আসে দুই গাল বেয়ে। অস্ফুটে বলে, 'বাবা.......'
এমন গল্প হয়ত খুঁজলে পরে অনেক পাওয়া যাবে। তার কারণ ভারতবর্ষে রক্তের জোগানে বরাবরের সমস্যা আছে। তবে স্বস্তির খবর এই যে রক্তদানের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষ সচেতন হচ্ছেন এবং রক্তদাতার সংখ্যাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। একটা ছোট্ট পরিসংখ্যানে বোঝানো যেতে পারে। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ২০০৬ - ০৭ সালে রক্তদাতার সংখ্যা ছিল ৫৪.৪ শতাংশ যা ২০১১ - ১২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮৩.১ শতাংশে। প্রতি ইউনিট রক্তের হিসাবে ২০০৬ - ০৭ সালে ৪.৪ মিলিয়ন ইউনিট থেকে ২০১২ - ১৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৯.৩ মিলিয়ন ইউনিটে। তবু চমকপ্রদভাবে, স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রক, ভারত সরকারের একটি রিপোর্টে জানা গেছে যে ২০১৬ সালে ১২ মিলিয়ন ইউনিটের চাহিদা অনুযায়ী শুধুমাত্র ১০.৯ মিলিয়ন ইউনিট রক্তই পাওয়া গেছে। সুতরাং ঘাটতির পরিমাণটা যে এখনও বিপুল তা এই সহজ অঙ্কের মাধ্যমেই বোঝা যায়। প্রয়োজন আরও সচেতনতার এবং এর উপকারিতাগুলি জেনে রাখার।
রক্তদানের উপকারিতা :
# হিমোক্রোমাটোসিস (Hemochromatosis) প্রতিরোধে সাহায্য করে - শরীরে লৌহমাত্রা বেড়ে গেলে এই ধরণের সমস্যা হয়। রক্তদানের ফলে এই সমস্যা হ্রাস পায় অনেকটাই।
# ক্যান্সারের ঝুঁকি কম থাকে।
# হৃদযন্ত্র, লিভার এবং অগ্ন্যাশয় সুস্থ থাকে।
# শরীরের ওজন কম রাখতে বেশ কার্যকরী ভূমিকা আছে রক্তদানের। বিশেষ করে যাঁরা স্থূল এবং কার্ডিওভাস্কুলার রোগে আক্রান্ত তাঁদের জন্য বিশেষ উপকারী।
# রক্তদানের দরুন নতুন রক্তকোষের জন্ম হয় এবং শরীর সুস্থ থাকে।
নূন্যতম বিধি :
রক্তদান একটি অত্যন্ত সুস্থ চিন্তা, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে অনেকেই হয়ত জানেন না যে চাইলেই কিন্তু রক্ত দেওয়া যায় না। রক্তদানের ক্ষেত্রে নূন্যতম কিছু বিধি মেনে চলা অতি আবশ্যক। স্বাস্থ্য ও পরিবার মন্ত্রক, ভারত সরকারের অধীনে কিছু নিয়ম শৃঙ্খলা বেঁধে দেওয়া হয়েছে যা একজন রক্তদাতার জেনে রাখা উচিত। যেমন -
# রক্তদাতাকে সম্পূর্ণ রূপে সুস্থ হতে হবে
# রক্তদাতার বয়স হতে হবে ১৮ - ৬৫ র মধ্যে
# ওজন নূন্যতম পক্ষে ৪৫ কিলোগ্রাম হতে হবে
# হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ন্যূনতম ১২.৫ গ্রাম হতে হবে
# পুরুষদের ক্ষেত্রে তিন মাসে একবার এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে চারমাসে একবার রক্তদান করা যাবে
# এছাড়া চিকিসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তদানের পূর্বে কিছু আবশ্যক পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে
ভারত সরকারের অধীন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় - এর একটি নির্দেশিকা আছে যা রক্তদানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পড়ুন।
রক্তদানের উপকারিতা যে যথেষ্ট তা আমরা জানলাম বটে তবে কতটা সচেতন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিষয়টা দেখব সেটাই সব থেকে বড় প্রশ্ন। এর কারণ হল আমাদের মধ্যে এখনো অনেকেই আছেন যাঁরা রক্তদান এড়িয়ে চলেন, বিভিন্ন রকমের অজুহাত দেন এবং সর্বোপরি রক্তদান সম্পর্কে বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। যেমন - রক্তদান করলে শরীরে খারাপ প্রভাব পড়তে পারে বা পরবর্তীকালে নানান রকম শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে ইত্যাদি। তাঁদেরকে বলব সময় করে নাহয় একবার আপনার চিকিৎসককেই জিজ্ঞেস করে দেখুন। তাঁর কথা নিশ্চই বিশ্বাসযোগ্য হবে এই আশা রাখি।
www.genesishospital.co
Tags :blooddonation ; donateblood ; savelife ; PrescriptionTheke ; GenesisHospitalKolkata









