Showing posts with label নিউরোলজি. Show all posts
Showing posts with label নিউরোলজি. Show all posts

Monday, 21 May 2018

ভুলভুলাইয়া


কেশব উদ্যানের চারপাশে গোল হয়ে পাক মারাটা রিটায়ার্ড নিবারণ চ্যাটার্জির বরাবরের অভ্যাস। আজ সকালেও তার অন্যথা হয় নি। তিনটে পাক মেরে আসার পর নিবারণ ক্লান্ত হয়ে একটা সিমেন্টের বেঞ্চির ওপর পা ঝুলিয়ে বসলেন। তারপর চোখ বুজে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলেন। এরপর খানিক বাদে ডানহাতের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনী দিয়ে নাক চেপে প্রাণায়াম শুরু করলেন। আসে পাশে প্রচুর মানুষ যে যার মতো মর্নিং ওয়াক এবং শরীর চর্চায় ব্যস্ত। বিকেল আর সকালের এই সময়টা পার্কে বেশ ভিড় হয়। পাশ থেকে পাড়ার একজন সমবয়েসী এসে নিবারণের কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন, 'কি হে ! কাল সন্ধ্যার আড্ডায় দেখলাম না তো, শরীর টরির খারাপ ছিল নাকি ? নিবারণ চোখ খুলে আগন্তুকের দিকে তাকালেন এবং আশ্চর্যভাবে কিছুতেই তাঁর নামটা মনে করে উঠতে পারলেন না। শুধু বুঝতে পারলেন এই আপাত অপিরিচিতের সাথে তাঁর বিলক্ষণ আলাপ আছে এবং কাল সন্ধ্যার আড্ডায় এই ভদ্রলোক গিয়েছিলেন।

নিবারণ কোনোরকমে একটা দেঁতো হাসি হেসে বললেন, 'হ্যাঁ মানে ওই আর কি, শরীরটা ঠিক........' । ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে আশ্বাসের ভঙ্গিতে বললেন, 'আচ্ছা আচ্ছা বেশ, আজকে এস কিন্তু ঠিক' । নিবারণ আমতা আমতা করে ঘাড় নাড়লেন কিন্তু লজ্জার চোটে কিছুতেই ওনার নামটা জিজ্ঞেস করে উঠতে পারলেন না। অপিরিচিত চলে গেলেন। এইবার নিবারণ ভারী মুস্কিলে পড়লেন। এই ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা বেশ কদিন ধরেই হচ্ছে তাঁর সাথে। ইদানিং যেন একটু বেড়েছে। আজ সামান্য একটা নাম মনে না পড়ায় ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে উঠলেন বেশ। শেষটায় বিরক্ত হয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেবেন বলে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু চমকের আরও বাকি ছিল। বাড়ির রাস্তাটা ঠিক কোন দিকে সেটা কিছুতেই ঠাহর করে উঠতে পারলেন না। এদিক ওদিক খুঁজে শেষটায় পাড়ার একটি ছেলেকে  চিনতে পেরে কোনোমতে তার সাথে বাড়ি অবধি এসে পৌঁছলেন। বিকেলের দিকে ডাক্তার এসে সমস্ত কিছু দেখে বললেন, 'আপনার খুব সম্ভব আলঝাইমার্স হয়েছে'। একথায় প্রায় হাঁ হয়ে গেলেন নিবারণ। এই রোগের সম্বন্ধে ডাক্তার আরও যা যা বললেন তা নিচে দেওয়া হল।

আলঝাইমার্স ডিজিজ একটি স্নায়বিক রোগ। এই রোগে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয় এবং তার ফলে স্মৃতি ও মস্তিষ্কের অন্যান্য কার্যকলাপের অবনতি ঘটে। এই রোগের প্রকোপ প্রাথমিক ভাবে সামান্য হলেও পরবর্তীকালে জটিল আকার ধারণ করে। এর ফলে মানুষ তার কাছের ব্যক্তিদের ভুলে যেতে পারে এবং সাংঘাতিক ভাবে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন আসতে পারে।

ডিমেনশিয়া (একটি মস্তিষ্কের রোগ) রোগের অন্যতম কারণ হল আলঝাইমার্স। ভারতবর্ষে প্রায় চল্লিশ লক্ষ মানুষ ডিমেনশিয়া দ্বারা আক্রান্ত, যার মধ্যে ১৬ লক্ষ মানুষের আলঝাইমার্স রয়েছে। ভয়াবহ ভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় তিনগুন। বিশেষত ৬৫ বা তার বেশি বয়েসের মানুষদেরই এই রোগ হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে ৬৫ বছরের কমেও এই রোগ হতে পারে। একে বলে আর্লি - অনসেট - আলঝাইমার্স। 

এই রোগের কারণ কি ?
যদিও সঠিকভাবে এর কারণ বলা মুশকিল তবে বিজ্ঞানীরা মনে করেন জিনগত কারণ, অর্থাৎ পরিবারের যদি কোনো সদস্যের আলঝাইমার্স থাকে তবে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া লাইফস্টাইল এবং পরিবেশগত বিষয় যা  সময়ের সাথে সাথে মস্তিষ্ককে নানা ভাবে প্রভাবিত করে তার ফলেও আলঝাইমার্স হতে পারে।  তবে এর ফলে মস্তিষ্কের যে প্রভূত ক্ষতি হয় তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। এক্ষেত্রে দুরকমের জটিলতা দেখা দেয়। 

# প্লাক - মস্তিষ্কের মধ্যে বিটা এমিলয়েড নামে একটি বিষাক্ত প্রোটিনের সমষ্টি তৈরী হয় যাকে প্লাক বলা হয়। এই প্রোটিন মস্তিষ্কের কোষগুলিকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে এবং কোষেদের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থাও ধ্বংস করে দেয়।
# ট্যাঙ্গল - মস্তিষ্কে, টাঊ নামক আরেক রকম প্রোটিন থাকে যার মাধ্যমে কোষের মধ্যে পুষ্টি সঞ্চার হয়। এই প্রোটিন যখন কোষের মধ্যে অস্বাভাবিক ভাবে জড়িয়ে যায় তখন সেই কোষের মৃত্যু ঘটে।

উপসর্গ কি কি ?
আলঝাইমার্সের ফলে মস্তিষ্কে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটতে থাকে। তা হল -

# স্মৃতিলোপ - স্বাভাবিক নিয়মে কিছু কিছু জিনিস ভুলে যাওয়াটা সমস্যার নয় তবে এক্ষেত্রে বাড়ির সদস্যদের নাম ভুলে যাওয়া, জরুরি জিনিস কোথায় থাকে তা মনে করতে না পারা, বারে বারে একই কথা বলা বা প্রশ্ন করা, ইত্যাদি আলঝাইমার্সের অন্যতম উপসর্গ।

# চিন্তাশক্তি লোপ পাওয়া - এক্ষেত্রে সংখ্যা বিষয়ক কাজে যথেষ্ট সমস্যা হয়। সঠিক সময় বাড়ির বিভিন্ন বিল জমা দেওয়া, হিসেব ঠিক রাখা, চেকবই, পাসবই সামলে রাখা প্রভৃতি কাজে ভুল হয় প্রচুর।

# সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা - নিয়মমাফিক কাজে জটিলতা তৈরী হয়। কোন কাজটা আগে বা পরে করা উচিত সেই নিয়ে ভীষণ সমস্যা দেখা দেয়।

# সাধারণ কাজে ভ্রান্তি - যেমন প্রতিদিন স্নান করা বা খাবার খাওয়ার কথাও ভুলে যেতে পারে আলঝাইমার্স রুগী। এছাড়া বাড়ির অন্যান্য কাজ করাতেও বেশ ভুল হতে পারে।

# ব্যক্তিত্বে ও ব্যবহারে পরিবর্তন - অবসাদ, ঔদাসীন্য, অবিশ্বাস, বিরক্তিভাব, অনর্থক ঘুরে বেড়ানো, ঘুমের সমস্যা, ইত্যাদি নানান রকমের পরিবর্তন আসতে পারে। এছাড়া নিজস্ব কিছু দক্ষতাও হারিয়ে যেতে পারে এই রোগে।

মৌলিক ভাবে এই রোগের তিনটি ধাপ আছে। যথা - ১. উপসর্গ দেখা দেওয়ার পূর্বে  ২. সামান্য উপসর্গ দেখা দেওয়া এবং ৩.ডিমেনশিয়া। অতএব এখন যে প্রশ্নটি উঠে আসতে পারে তা হল এই রোগের হাত থেকে মুক্তি পাবার উপায় কি ?


চিকিৎসা কি ?
একটা মজার তথ্য দিই। প্রচলিত জনশ্রুতি আছে যে সিগারেট খেলে বা নারকোল তেলের ব্যবহারে নাকি আলঝেইমার্স সেরে যায়। অবাক হবেন না কারণ এই ধরণের কোনোরকম প্রমান কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে নেই। আলঝাইমার্স হলে এই রোগ থেকে মুক্তি পাবার কোনো উপায় যে নেই এটা প্রথমেই পরিষ্কার করে আমাদের জেনে রাখা দরকার। তার কারণ মস্তিষ্কের যে কোষগুলির মৃত্যু হয়েছে তাদের পুনর্জন্মের কোনো সম্ভাবনা নেই। কিছু ওষুধ আছে যার ব্যবহারে বাকি জীবনটা এই রোগ নিয়ে বেঁচে থাকাটা একটু সহজ হয়। তবে এই ওষুধে আলঝাইমার্স সারে না, উপসর্গ কিছুটা কম হতে পারে। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি ডেপ্রিনাইল নাম একটি ওষুধ আছে যা মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণে সাহায্য করে। যার ফলে দৈনিক বা ব্যবহারিক কাজে একটু উন্নতি লাভ হয়। তবে অবশ্যই এক্ষেত্রে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বাঞ্ছনীয়। এছাড়া শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ভাবে যদি সচল থাকা যায় বা মূলত আনন্দে থাকা যায় তাহলে পরবর্তী জীবনটা অনেক শান্তিপূর্ণ হয় এ বলাই বাহুল্য।

পুরোটা শুনে নিবারণ চ্যাটার্জি কতকটা বিমর্ষ হলেন বটে তবে ডাক্তারের উপদেশ মেনে এরপর থেকে সাবধানে চলা ফেরা করার মনস্থির করলেন। তাঁর বিভিন্ন আড্ডাস্থলে জানিয়ে রাখলেন এই রোগের কথা। এবং তেমন বিপদ বুঝলে বাড়ি ফেরা বা অন্যান্য জরুরি কাজকর্ম করারও একটা বন্দোবস্ত করলেন। সুতরাং নিবারণের মতো আপনিও যদি এই রোগের শিকার হন তাহলে প্রথমেই একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের মতামত অনুযায়ী সাবধান হন এবং সেইমতো কাজ করুন। বলা তো যায়না কি থেকে কি বিপদ হতে পারে ! 


#alzheimer'sdisease #oldagedisease #neurology #neurologicalproblem #neurologicaldisease #AsPrescribed #GenesisHospitalKolkata

Thursday, 19 April 2018

স্নায়ুর জালে

অরিজিৎ ও পারমিতা, উত্তর কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালি দম্পতি। দোতলার বাড়িতে সাজানো গোছানো সংসার। দিন কেটে যায় সচ্ছলতার ডানায় ভর করে। সুখ আছে, তবু যেন দুজনের মনে শান্তি নেই। একমাত্র সন্তান ধ্রবজ্যোতির বয়স সাড়ে তিন বছর। অন্য আর চার পাঁচটা সমবয়সীদের থেকে যেন বড্ড আলাদা। কোথায় এই সময়টা ধ্রুবজ্যোতি মেল্ ট্রেনের মতো ছুটবে, চড়াইপাখির মতো দুরন্ত পায় সারা বাড়ি তোলপাড় করবে অথচ কোনো এক অলৌকিক  জাদুবলে ধ্রুবজ্যোতি যেন ভীষণরকম শান্ত। তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা ছিল না কিন্তু ছেলের যেন কোনো কিছুতেই কোনো স্পৃহা নেই। ডাকলে সাড়া দেয় না, খেলাধুলার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, সারাক্ষন শুধু বারান্দার ধারে বসে সমানে কাগজ ছিঁড়তে থাকে। কোনো কথার উত্তর দেয় না ঠিকমতো, বন্ধুবান্ধবে আগ্রহ নেই তবে হঠাৎ করে কোনো কোনো বায়না ধরলে তা একনাগাড়ে বলতে থাকে। কোনোরকম বারণ বা শাসন গ্রাহ্য করে না। সাতপাঁচ ভেবে একজন নামকরা শিশুবিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলেন অরিজিৎ ও পারমিতা। সমস্তটা দেখে তিনি বললেন ধ্রবজ্যোতি এস্পারগার্স সিন্ড্রোম অর্থাৎ অটিজমে আক্রান্ত। এখন থেকেই তার চিকিৎসার প্রয়োজন। অরিজিৎ ও পারমিতার মাথায় যেন বাজ পড়ল। এই গল্প বলার আগে আসুন জেনে নিই কি এই রোগ আর এর হাত থেকে নিস্তার পাবার উপায় কি। 


অটিজম কি ?
অটিজম সোসাইটি অফ আমেরিকার মতে এটি একটি জটিল স্নায়বিক রোগ যা মস্তিষ্কের অক্ষমতার কারণে হয়ে থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ কথাবার্তায় এবং ব্যবহারে। ইন্ডিয়ান স্কেল এসেসমেন্ট অফ অটিজম - এর মতে ভারতবর্ষে প্রায় ২০ লক্ষ শিশু এই রোগের শিকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতি ৬৮ জন শিশুতে ১ জন শিশুর এই রোগ হয়। সর্বোপরি একটা আশ্চর্য তথ্য দিই। সারা বিশ্ব জুড়ে ৭ কোটি মানুষ রয়েছেন যাঁদের অটিজম আছে। তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হল এঁদের মধ্যে ১ কোটি মানুষ হলেন ভারতীয়।

এই রোগের কারণ কি ? 
নিয়মিত গবেষণার ফলে কিছু কারণ চিহ্নিত করা যায়। যেমন -

# জিনগত বিরল সমস্যা, পরিবেশগত চাপ, গর্ভকালীন অবস্থায় পিতামাতার বয়স, গর্ভাবস্থায় মায়ের কোনো রোগ, জন্মের সময় শিশুর মস্তিষ্কে অপর্যাপ্ত অক্সিজেন প্রবাহ ইত্যাদি।
# এছাড়া মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যক্ষমতায় অস্বাভাবিকতার দরুণও অটিজম হতে পারে।

এই রোগ কি একই রকমের হয় ?
একদমই না। এই রোগের বিভিন্ন প্রকার আছে এবং প্রকারগত সমস্যাও একেবারেই আলাদা। সুতরাং শিশুটির কোন অটিজম হয়েছে সে ব্যাপারে জেনে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

# এস্পারগার্স সিন্ড্রোম - এই রোগে সাধারণত কোনো বস্তু বা বিষয়ের ওপর সাংঘাতিক আকর্ষণ থাকে। একই কাজ বারেবারে করার একটা প্রবণতা থাকে। এই রোগে আক্রান্ত শিশুরা স্বাভাবিক গড় বা গড়ের থেকে বেশি বুদ্ধিমান হয়। সেই কারণে একে হাই - ফাঙ্কশনিং অটিজমও বলা হয়।

# পারভেসিভ ডেভেলপ্মেন্টাল ডিসর্ডার -  সামাজিক মেলামেশা এবং কথা বলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সমস্যা হয়। এস্পারগার্স সিন্ড্রোমের তুলনায় আচরণগত সমস্যা কম।

# অটিস্টিক ডিসর্ডার - উপরোক্ত দুই প্রকারের তুলনায় এটি অত্যন্ত জটিল। এক্ষেত্রে সামাজিকতা ও কথাবলায় সমস্যা তো আছেই তাছাড়া মানসিক প্রতিবন্ধকতাও হতে পারে।

কিভাবে বুঝবেন বা উপসর্গ কি ?
জেনেসিস হাসপাতালের শিশু বিভাগের একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক বলছেন যে সামাজিক ভাবে এই রোগ নিয়ে একটা সমস্যা আছে। মানুষকে বুঝতে হবে যে এই রোগ যদি প্রাথমিক ভাবে নির্ণয় করা যায় এবং শিশুদের পর্যাপ্ত সাহায্য করা যায় তাহলে সেই শিশুটিও অন্যদের মতো বেড়ে উঠবে। সমাজে তারও অবদান থাকবে এবং পাশাপাশি অন্যের ওপরেও নির্ভরশীল হতে হবে না। এই রোগ নির্ণয়ের কিছু সহজ পন্থা আছে, যেমন -

# শিশুটির যদি খেলনার প্রতি কোনো আকর্ষণ না থাকে
# ডাকলে যদি সাড়া না দেয়
# যদি নিজের খেয়ালেই ব্যস্ত থাকে
# একই কথা বারবার বলতে থাকে
# কথাবলার সময় যদি সরাসরি চোখের দিকে না তাকায় অথবা
# অন্যদের সাথে মেলামেশায় সমস্যা হয় তাহলে
একজন শিশু বিশেষজ্ঞের সাথে অবিলম্বে যোগাযোগ করতে হবে। অনেক সময় দেখা গেছে যে বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের পাঁচ বছর বয়েসে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন। কিন্তু এক্ষেত্রে একেবারে প্রথম দিকে অর্থাৎ দু আড়াই বছর বয়েসেই ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করাই উচিত। তাতে করে প্রাথমিক ভাবেই শিশুটির চিকিৎসা শুরু হবে এবং মনোবিজ্ঞানীদের সাহায্যে বয়সচিত কাজের সাথেও পরিচিত হতে পারবে। যার দরুণ সুফল পাওয়া যাবে তাড়াতাড়ি। জেনে রাখবেন, বয়েস বেড়ে গেলে বিভিন্ন কাজের সাথে খাপ খাওয়াতে অসুবিধে হবে।

এক্ষেত্রে কি করণীয় ?
# বাবা মার কার্যকরী ভূমিকা -  বাবা মাকে ভীষণভাবে সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং সমস্ত ক্ষেত্রে ধৈর্য ধরতে হবে।
# সুসম্পর্ক স্থাপন - সন্তানের সাথে বাবা মার অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ সম্পর্ক হতে হবে। সন্তানের পড়াশোনা এবং সঠিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে হবে।
# বিশেষজ্ঞর মতামত - সর্বপ্রথম একজন শিশু বিশেষজ্ঞর পরামর্শ ভীষণ প্রয়োজন। তাঁর মতামত অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলাই বাঞ্ছনীয়। 
# সংশ্লিষ্ট সংস্থার সাথে যোগাযোগ - কিছু সংস্থা আছে যারা অত্যন্ত যত্নসহকারে এই শিশুদের পড়াশোনা ও অন্যান্য বিষয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন ট্রেনিং, থেরাপি ও এক্টিভিটির মাধ্যমে শিশুটির সর্বাঙ্গীন উন্নতি সাধন করুন। এক্ষেত্রে বাবা মায়েদেরও বিশেষ প্রশিক্ষণ নিতে হয়। নিম্নলিখিত লিঙ্কগুলিতে যোগাযোগ করতে পারেন।
http://autismsupport.in/helpline-region/west-bengal/#s=1
http://www.pradipautism.org/#
http://shruti.co.in
http://motherandchildschool.com/index.html

কয়েক বছর ধরে, একটি অটিজম সেন্টারের যোগ্য সহায়তায় ও নিয়মিত ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে ধ্রুবজ্যোতি ধীরে ধীরে তার প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠছে। অরিজিৎ ও পারমিতার মুখে এখন স্বস্তির ছাপ। তাঁদের একমাত্র সন্তান নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেছে। সন্ধ্যের দিকে সে নিয়মিত বইখাতা খুলে বসে। কয়েকজন বন্ধুবান্ধব হওয়াতে ক্রিকেটের প্রতি তার একটা বিশেষ আগ্রহ জন্মেছে। ভারতবর্ষের বহু বাড়িতে এমন ধ্রুবজ্যোতিরা অনেকেই রয়েছে। এমন ভাবার কিন্তু কোনো কারণ নেই যে তারা সময়পোযোগী হয়ে উঠতে পারবে না। বরং সঠিক দিশা পেলে নিজ নিজ বিষয়ে তারা যথেষ্ট যোগ্যতা প্রমান করতে পারে যার নজির কিন্তু প্রচুর রয়েছে। প্রয়োজন একটু দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর, একটু সহনীয় মনোভাবের........ মনে রাখতে হবে তারাও এ পৃথিবীর সন্তান।

#Autism #Worldautismday #autisticchildren #neurology #neurologicaldisorder #AsPrescribed #GenesisHospitalKolkata

Saturday, 24 February 2018

দুরন্ত এক্সপ্রেস #





গৃহবধূ রণিতা বসু ঘুম ভেঙে আঁতকে উঠলেন। বিছানায় বাবলু নেই তার পাশে। এঘর ওঘর খুঁজে কোত্থাও না পেয়ে শেষটায় বাইরে বেরিয়ে এসে দেখলেন তার আদরের বাবলু বাগানের মাটি খুঁড়ে একাকার করেছে। রাগের বশে একছুটে তিনি দুম করে এক কিল বসিয়ে দিলেন বাবলুর পিঠে। চার বছরের বাবলু সে কিলের তোয়াক্কা না করে দৌড়ে গিয়ে একপাশে ঝোলানো দোলনার চেন ধরে অবলীলায় হনুমানের মতো দোল খেতে লাগলো। রণিতা সেখানেও তাকে তাড়া করায় সে কলা দেখিয়ে সেখান থেকেও পালালো। তারপর রান্নাঘরে ঢুকে একটা স্টিলের থালা আর হাতা নিয়ে মনের সুখে বাজনা বাজাতে শুরু করল। বাগানের মধ্যেই রণিতা মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। সংসারের সমস্ত কাজ সামলালেও তার আদরের বাবলুকে তিনি কিছুতেই যেন সামলে উঠতে পারছেন না। বাবলু চরম দুরন্ত হয়েছে, আর চার পাঁচটা ছেলে মেয়েদের থাকে বড্ড আলাদা। কারোর কোনো কথা তো শোনেই না উল্টে সর্বক্ষণই যেন এক্সপ্রেস ট্রেনের মতো এদিক থেকে ওদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। শেষটায় একদিন স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করলেন একজন মনোবিদের সাথে। সমস্তটা দেখে তিনি বললেন বাবলুর এডিএইচডি (ADHD) অর্থাৎ এটেনশন ডেফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিসর্ডার আছে।এডিএইচডি কি এবং কেন হয় জানার আগে ছোট্ট করে দেখে নিন একটা পরিসংখ্যান। 

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ভারতবর্ষে প্রাথমিক স্কুল শিশুদের মধ্যে এডিএইচডির প্রভাব রয়েছে  প্রায় ১১.৩২ % । আরও জানা গেছে যে তুলনামূলক ভাবে নারী শিশুদের (৩৩.৩%) থেকে পুরুষ শিশুদের (৬৬.৭%) ক্ষেত্রেই বেশি এডিএইচডি হয়। পড়লে আশ্চর্য হবেন, নিম্ন আর্থ - সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব প্রায় ১৬.৩৩ % এবং মধ্য আর্থ - সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব ৬.৮৪% ।  এডিএইচডি হবার কারণ কি ?

কারণ 
এডিএইচডি হবার সঠিক কারণ এখনো পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে বলা যায় নি। তবে চিকিৎসক এবং গবেষকরা কয়েকটি নিম্নলিখিত কারণ বলছেন।  

# একটি এডিএইচডি শিশুর মস্তিস্ক সাধারণ শিশুর মস্তিষ্কের থেকে ৫% ছোট হয়। বিশেষ করে সেই সমস্ত জায়গাগুলি যেগুলি মনোযোগ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সাথে জড়িত। নিউরোট্রান্সমিটার নরএপিনেফ্রিন এবং ডোপামিনের অসামঞ্জস্য - এক্ষেত্রে একটি কারণ হতে পারে।

# মস্তিষ্কে রাসায়নিক, কাঠামোগত বা সংযোগের পার্থক্য হলে এডিএইচডি হয়। বেশীরভাগটাই জিনগত কারণে।

# এছাড়া গর্ভাবস্থায় ড্রাগের ব্যবহার বা মদ্যপান করলেও এডিএইচডি হতে পারে।

বৈশিষ্ট 
এডিএইচডির প্রধান বৈশিষ্টগুলি হল -
# অমনোযোগ - পড়াশোনার সময় অধ্যাবসায়ের অভাব ভীষণ ভাবে লক্ষ্য করা যায়। সাধারণত শিশুটি একেবারেই মনোযোগী হয় না এবং সুষ্ঠভাবে কোনো কাজই করে উঠতে পারে না। তবে মনে রাখতে হবে এর অর্থ কিন্তু শিশুটি অবাধ্য বা তার বুঝতে সমস্যা হচ্ছে, এমনটা কিন্তু নয়।

# অতিচাঞ্চল্য - মাত্রাতিরিক্ত চঞ্চলতার ফলে শিশুটিকে একজায়গায় বসিয়ে রাখা সম্ভব হয় না কিছুতেই। এর ফলে অনেকসময়ই প্রতিকুল পরিস্থিতি তৈরী হতে পারে। সাধারণত এরা একটানা কোনো একটা কাজ করতে থাকে বা অনর্গল কথা বলতে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাজে  অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা যায়।

# অতিআবেগপ্রবণ - এরা ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়। কোনো রকম জটিলতা বা ভবিষ্যতের কথা না ভেবেই কোনো কাজ করে ফেলাটা এদের অন্যতম লক্ষণ। "উঠল বাই তো কটক যাই" - এই প্রবাদটা এদের ক্ষেত্রেই বোধহয় বেশি করে খাটে।

উপসর্গ 
অমনোযোগীর ক্ষেত্রে 

# স্কুলের কাজে বা অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত ভুল করা

# কোনো লেকচার বা আলোচনার সময় অমনোযোগী হওয়া, এছাড়া পড়ার সময় বারে বারে মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলা

# কারোর কথা না শোনা এবং স্কুল, বাড়ি বা অফিসের কাজ সময়মত শেষ করতে না পারা

# সংগঠিত ভাবে কাজ করায় সমস্যা, যেমন কোন কাজটা আগে বা পরে করা জরুরি, স্কুলে বা কাজের ক্ষেত্রে ডেডলাইন মিট করতে ব্যর্থ হওয়া।

# জিনিসপত্র এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা

# জরুরী কাজে অনীহা, যেমন হোমওয়ার্ক না করতে চাওয়া।  প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অফিসের জরুরি কাজগুলি নিয়মিত এড়িয়ে যাওয়া

# মাঝেমাঝেই নিজের জিনিসপত্র হারিয়ে ফেলা

# উদ্ভট চিন্তাভাবনায় মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলা

# প্রতিদিনের কাজ প্রায়ই ভুলে যাওয়া

অতিচাঞ্চল্য বা অতিআবেগপ্রবণতার ক্ষেত্রে 

# সারাক্ষণ উসখুস করা

# হঠাৎ করে নিজের সিট্ থেকে উঠে পড়া

# অনুপযুক্ত পরিস্থিতিতে সহজেই জড়িয়ে পড়া

# সর্বক্ষণ ছটফট করা বা একটা অস্থির ভাব থাকা

# অনর্গল কথা বলে যাওয়া

# প্রশ্ন শেষ হবার আগেই উত্তর দেওয়া, কোনো একটা আলোচনার মধ্যে হঠাৎ করে কথা বলে ওঠা

# অন্যের কাজে বাধা দেওয়া, ইত্যাদি

চিকিৎসা
এডিএইচডি একেবারে সেরে যাবে এমন কোনো ওষুধ বা পদ্ধতি এখনো অবধি বেরোয়নি। তবে বিশেষ চিকিৎসার দ্বারা এর উপসর্গগুলি কমানো যেতে পারে এবং কাজের ক্ষেত্রে অনেকটা উন্নতি লাভ করা যেতে পারে। যেমন - 

# ওষুধ - বেশ কিছু ক্ষেত্রে ওষুধের সাহায্যে অতিচাঞ্চল্য এবং আবেগপ্রবণতা  কমানো সম্ভব। এর ফলে কাজ বা পড়াশোনার ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যায়। এডিএইচডির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রচলিত ওষুধ হল 'স্টিমুল্যান্ট'। এই ওষুধটি মস্তিষ্কে নরএপিনেফ্রিন এবং ডোপামিন বাড়াতে সাহায্য করে। তবে এর কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াও আছে। চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করে নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয়।

# সাইকোথেরাপি - বিহেভিওরাল থেরাপি দ্বারা একজন শিশুর ব্যবহার বা তার কাজের প্রতি মনোভাব বদলানো সম্ভব। এর মাধ্যমে সামাজিক দক্ষতা, অন্যের প্রতি ব্যবহার বা মনোভাবের যথেষ্ট উন্নতি হয়।এছাড়া ফ্যামিলি এন্ড ম্যারিটাল থেরাপির দ্বারা স্বামী, স্ত্রী বা পরিবারের বাকি সদস্যদের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি সাধন করা যায়। 

# শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ - পেরেন্টিং স্কিল ট্রেনিং এবং স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট টেকনিকের মাধ্যমে বাবা মায়েদের শেখানো হয় কিভাবে একজন এডিএইচডি শিশুকে সামলানো উচিত। পরিস্থিতি বিচারে শিশুটিকে যেমন পুরস্কৃত করতে হবে আবার সময়বিশেষে কঠোরও হতে হবে। আবার জটিল পরিস্থিতিতে কিভাবে নিজেদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে শিশুটিকে সামলানো উচিৎ তারও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এছাড়া সাপোর্ট গ্রূপের সাহায্যে শিশুদের বাবা মায়েরা একে অন্যের সাথে সমস্যার কথা আলোচনা করতে পারেন এবং কি কি ভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে তারও একটা সম্যক ধারণা তৈরী করতে পারেন। এতেও যথেষ্ট সুফল পাওয়া যায়।

# মিরাক্যালস এবং টার্নিং পয়েন্ট নামে দুটি সংস্থা আছে যাঁরা কলকাতায় এডিএইচডি শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। যথাক্রমে ওয়েবসাইট হল - http://www.miraclespecialschool.com/contact-us.html . এবং http://www.turningpoint.org.in/disha.asp. এছাড়া ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্স, পার্ক স্ট্রিট - এ এই শিশুদের চিকিৎসা করা হয়।

সুতরাং ধৈর্য ধরে রাখাটাই কিন্তু এক্ষেত্রে সবথেকে জরুরী। নিয়মিত শিশুটিকে সময় দিতে হবে এবং তার সমস্ত ব্যবহার বা কাজের দিকে মনোযোগ দিয়ে তার মনোভাব বদলানোর চেষ্টা করতে হবে। মাথা গরম করে দু চার ঘা দিয়ে ফেললে কিন্তু শিশু এবং তার বাবা মা, দুজনেরই লোকসান বই লাভ কিছু হবে না। বরং দিনে অন্তত কিছুটা সময় বাইরে নিয়ে গিয়ে খোলা মাঠে খেলতে দিন। ঘুমোনোর নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিন এবং ঘুমোনোর বেশ কিছুটা আগে টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল বন্ধ রাখুন। প্রয়োজনমত স্কুল থেকে আপনার সন্তানের রিপোর্ট চেক করুন। লক্ষ্য রাখুন কমপ্লেন খুব বেশি আসছে কিনা। সেক্ষেত্রে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে বসে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজে বার করুন। বলাই বাহুল্য আপনার শিশুটিকে সঠিক ভাবে পথ দেখানো কিন্তু আপনারই দায়িত্ব, এটা ভুলে গেলে কিন্তু বড় রকমের গাড্ডায় পড়তে হবে। #ADHD #attentiondeficithyperactivitydisorder #medicalarticle #learningdisabilities #learningdisorder #GenesisHospitalKolkata #AsPrescribed

Tuesday, 13 February 2018

তারাদের কথা


যে বিষয়ে নিয়ে একটা গোটা হিন্দী ছবি তৈরী হয়েছে, সেই বিষয়ের নাম আমাদের প্রায় সকলেরই জানা। কিন্তু শুধু জেনে রাখলেই কাজ শেষ হয় না, বরং সেখান থেকেই শুরু । ছবিতে ঈশান অবস্তির করুণ সময়ের কথা ভাবলেই আমাদের বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে। 'তুঝে সব হ্যায় পাতা....মেরি মা' এই গান শুনলে আজও চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, একথা সত্যি, কিন্তু বিশ্বাস করুন, ব্যাস ! ওই পর্যন্তই। পরবর্তী সময়ের সংগ্রাম ও নিরলস পরিশ্রমের কথা আমরা ভাবতেও পারি না, তার কারণ আমরা একটা গল্প তৈরী হতে দেখেছি, চেষ্টা করেছি সে গল্পের সাথে বাঁচতে কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে অনুভব করিনি। আমাদের বাড়িতে যদি এমনই একজন ডিস্লেক্সিক শিশু থাকত তাহলে কিন্তু সমস্যাটা আর রুপালি পর্দার মোড়কে বন্দী হয়ে থাকত না। দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব বোধহয় পাহাড়ের থেকেও ভারী মনে হত তখন। কঠিন হলেও এমন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার কি কি উপায় আছে আসুন একটু দেখে নিই।     

ডিস্লেক্সিয়া কি ?
ডিস্লেক্সিক একটি গ্রীক শব্দ যার অর্থ হল শব্দের সমস্যা। এর নানা রকম সংজ্ঞা থাকতে পারে, তবে  সহজ ভাষায় ডিস্লেক্সিয়া হল একপ্রকার অক্ষমতা যার দরুন পড়তে, লিখতে বা বুঝতে সমস্যা হয়। জেনে রাখা ভালো যে এই সমস্যাটি কিন্তু সম্পূর্ণ ভাষাগত এবং এর সাথে বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং বাড়িতে যদি ডিস্লেক্সিক শিশু থাকে তাহলে তার মেধা নিয়ে আশঙ্কিত হবার কোনো প্রয়োজন নেই। দেখা গেছে শিশুরা ডিস্লেক্সিক হলেও অন্যান্য বিষয়ে তারা বেশ প্রতিভাশালী হয়। এমন চমকপ্রদ উদাহরণ বহু আছে। তবে তার আগে জেনে নিই ঠিক কি কারণে ডিস্লেক্সিয়া হয়। 

কি কারণ ?
ডিস্লেক্সিয়া এসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে ভারতবর্ষে প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ স্কুল পড়ুয়া শিশুরা কোনো না কোনো ভাবে ডিস্লেক্সিয়ায় আক্রান্ত। আমাদের দেশের বহুভাষার সমস্যাও কিন্তু এর অন্যতম কারণ হতে পারে। সাধারণত ডিস্লেক্সিয়ার সঠিক কারণ চিহ্নিত করা যায় নি, তবু কিছু তথ্যের ফলে একটা সম্যক ধারণা তৈরী করা যায়। যেমন - আমরা জানি যে একজন বাঁহাতির ক্ষেত্রে ডানদিকের মস্তিস্ক বেশি সক্রিয় এবং একজন ডানহাতির ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের বাঁদিক। কিন্তু একজন ডিস্লেক্সিকের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কোন দিকটি বেশি সক্রিয় তা নিয়ে বিভ্রান্তির ফলে তথ্যের সরলীকরণে সমস্যা হয়। এছাড়া জিনগত বা পরিবেশগত কারণেও ডিস্লেক্সিয়া হতে পারে। তাহলে কিভাবে বুঝবেন একটি শিশু ডিস্লেক্সিক ? আসুন জেনে নিই। 

উপসর্গ কি ?
# পড়বার সময়ে সমস্যা  
# ডিস্লেক্সিক শিশুদের তুলনামূলক ভাবে সাধারণ কাজে দেরি হয় বেশি - যেমন হাঁটাচলা, কথা বলা, সাইকেল চড়া ইত্যাদি 
# ভুল উচ্চারণ করা, ছড়া বলায় সমস্যা এবং শব্দের তফাৎ করতে না পারা 
# অক্ষর ও তার উচ্চারণে বিলম্ব হওয়া, রঙ চিনতে সমস্যা হওয়া বা গণিতে অসুবিধা 
# সাধারণ খেলাধুলায় সমস্যা 
# ডানদিক - বাঁদিক গুলিয়ে ফেলা 
# অক্ষর বা সংখ্যা উল্টো করে লেখা এবং বানানে সমস্যা 
# কোনো কাজে মনোযোগী না হওয়া
# ডিস্লেক্সিক শিশুরা এমনভাবে পরপর তাদের ভাবনাগুলিকে ব্যক্ত করে যা অযৌক্তিক বা অপ্রয়োজনীয়ও মনে হতে পারে
# এছাড়া এজমা, এক্জিমা বা অন্য ধরণের এলার্জিও হয়ে থাকে ডিস্লেক্সিক শিশুদের 

এ সমস্যার সমাধান কি ?
এই ধরণের সমস্যা অবহেলা করা একেবারেই উচিত নয়। বরং বাবা মায়েদের আরেকটু বেশি যত্নবান হতে হবে, তাহলেই সমস্যাগুলি সহজে ধরা পড়বে।

# প্রথমেই ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে শুরু করুন। তাহলে শিশুটির পক্ষে সমস্ত কিছু বুঝতে অনেকটাই সহজ হবে। কোনোভাবেই ধৈর্য হারানো চলবে না।  

# ডিস্লেক্সিক শিশুদের সাধারণত জানার ইচ্ছে প্রবল হয়। যুক্তিসম্মত উত্তর পেলে শিখতে দেরি হয় না তাদের। লেখার ওপর জোর দিন বেশি, শুধুমাত্র কানে শুনে শিখে ফেলা কঠিন কিন্তু। 

# বিজ্ঞানের বিষয়গুলি টেবিল বা চার্টের মাধ্যমে বোঝান। এতে সহজ হবে অনেকটাই।

# অডিও ভিজ্যুয়াল পদ্ধতিতে বেশ সুফল পাওয়া যায়। যে কোনো বিষয় চিত্রের মাধ্যমে বোঝালে মনে রাখতে সুবিধে হবে। 

#  বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতিতে স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধির ওপর জোর দিন। যেমন - একটা প্যারাগ্রাফ পড়ানোর পর বিভিন্ন ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্ন করুন। এতে ভালো কাজ দেয়। 
# ফ্ল্যাশ কার্ডের সাহায্যে শেখালে ভালো হয়। নির্দিষ্ট সময়ের পরপর পুনরায় চেষ্টা করুন। 

# বস্তুর আকৃতি ও আয়তন সঠিক ভাবে বুঝিয়ে দিন। যেমন - বৃত্ত ও গোলকের তফাৎ বুঝিয়ে দিন সুনির্দিষ্ট ভাবে। জ্যামিতিক আকারগুলি ভালো করে বোঝানো প্রয়োজন। 

# নিয়মিত যোগাসন মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। শিশুদের অভ্যেস করান, সুফল পাবেন।

# স্কুলের শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের সাথে আলোচনা করে বিশিষ্ট চিকিৎসকদের নিয়ে এই বিষয়ের ওপর সেমিনার করতে পারেন। এতে দু পক্ষই উপকৃত হবে।

# ডিস্লেক্সিক শিশুদের চিহ্নিত করার কিছু টেস্ট আছে। এই লিংকটি ক্লিক করে জেনে নিন আপনার বা আপনার পরিচিত কোনো শিশু ডিস্লেক্সিক নয়তো ! https://www.lexercise.com/tests/dyslexia-test
উপরন্তু কলকাতার বুকে একটি সংস্থা আছে যাঁরা ডিস্লেক্সিক শিশুদের অত্যন্ত যত্ন নিয়ে শেখান। তাঁদের ওয়েবসাইটের লিংক দেওয়া হল -  http://www.breakingthroughdyslexia.com/index.php
এছাড়া কলকাতায় এমন অনেক স্কুল আছে যেখানে অন্যান্য শিশুদের সাথেই ডিস্লেক্সিক শিশুদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। 

ঈশান অবস্তি গল্পের চরিত্র হলেও বাস্তবিক এমন অনেকেই আছেন যাঁরা ডিস্লেক্সিক হয়েও পরবর্তী জীবনে সাফল্যের উচ্চতায় পৌঁছেছেন। উদাহরণস্বরূপ যাঁদের নাম বলছি তাঁরা অতীব জনপ্রিয় শুধু নন, স্ববিভাগে নির্দিষ্ট ছাপ রেখে গেছেন। তাঁরা দেখিয়ে গেছেন প্রতিভা গোপন থাকে না, সঠিক সময় নিজ গুণবলে নক্ষত্রের মত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তাঁরা হলেন - এলবার্ট আইনস্টাইন, পাবলো পিকাসো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, জর্জ ওয়াশিংটন, জন এফ কেনেডি, ওয়াল্ট ডিজনি, জন লেনন, রিচার্ড ব্র্যানসন, স্টিভেন স্পিলবার্গ, টম ক্রুজ, জিম ক্যারি এবং আরও অনেক বিখ্যাতরা যাঁদের নাম বলতে গেলে এই লেখা হয়ত কোনোদিন শেষ হবে না। 

সুতরাং আপনার বাড়িতে যদি একজন ডিস্লেক্সিক শিশু থাকে তাহলে ভেঙে না পড়ে তার প্রতিভার দিকে নজর দিন। কে জানে হয়ত কোনো একদিন তারই কৃতিত্বে আপনি গর্বিত হবেন। আপনার মতো করে নয়, ওদের চোখ দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে শিখুন, কতকটা ওদের মতো করেই বাঁচুন, এ পৃথিবী অনেক নিষ্পাপ ও আলোকজ্জ্বল মনে হবে, আমি একশোভাগ নিশ্চিত।

#Dyslexia #DyslexiaAssociationofIndia #Learningdisability #Learningdisorder #Medicalarticle #GenesisHospitalKolkata #AsPrescribed 

Thursday, 23 November 2017

মিনি স্ট্রোক


ডায়মন্ড হারবারের শেষ মাথায় একটি জনপ্রিয় হোটেলের মালিক সুরঞ্জন চৌধুরী। যেমন সাজানো গোছানো পরিবেশ ততোধিক উপাদেয় পঞ্চব্যঞ্জন। গঙ্গার পারে ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে এই হোটেলে লাঞ্চ বা ডিনার সেরে নেওয়াটা অধিকাংশ ট্যুরিষ্টেরই পছন্দেরই তালিকায় থাকে। গোলগাল, অমায়িক সুরঞ্জনের ব্যবহার ও আপ্যায়নে অতিথিরা দিব্যি মজে থাকেন। বহু বছরের পুরোনো হোটেলটি যে ঐতিহ্য ও খ্যাতিতে অন্যান্য হোটেলগুলির থেকে কয়েক কদম এগিয়ে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ নিয়ে ষাটোর্দ্ধ সুরঞ্জন গর্বও করেন বেশ। কিন্তু তাঁর গর্বের ফানুশ যে হাওয়ায় দুলতে দুলতে একেবারে গঙ্গার ঘাটে সলিল সমাধি ঘটাবে তা আর কে জানত ! কি হল ? শুনুন তাহলে।

কোনো এক বসন্তের সন্ধ্যায় এক সদ্য বিবাহিত তরুণ তরুণী প্রেমের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে একটি রুমের সন্ধানে উপস্থিত হলেন সুরঞ্জনের হোটেলে। সুরঞ্জন মিষ্টি হেসে তাদের আপ্যায়ন করলেন ও অনতিদূরেই একটি সোফায় বসালেন। অফিসিয়াল ফর্মালিটি সারতে সারতে কতকটা আকস্মিক ভাবেই সুরঞ্জনের বাঁদিকের চোখ ও মুখ নাচতে লাগল। দূর থেকে দেখে নব পরিণীতা বধূ মনে করলেন, সুরঞ্জন বুঝি তাকে অশালীন ইঙ্গিত করছেন। প্রথমটায় তিনি তেমন পাত্তা দিলেন না। কিন্তু  কেলেঙ্কারির আরো কিছুটা বাকি ছিল। যখন কিছুক্ষন বাদে বাদেই আবার সুরঞ্জনের চোখ মুখ সমান তালে নড়তে লাগল তখন তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। উঠে এসে ঠাস করে এক চড় মেরে সুরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কি ইতর লোক মশাই আপনি ? সমানে আমাকে চোখ মারছেন তখন থেকে ? এই বয়েসে লজ্জা করে না' ? সুরঞ্জন গালে হাত দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এটা কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না। আশ্চর্যের বিষয় হল সুরঞ্জন চড় খাওয়ার পরও কিছুতেই চোখ ও মুখের মুভমেন্ট কন্ট্রোল করতে পারছিলেন না। সেটা দেখে যুবক স্বামীটি এগিয়ে এসে ভালো করে নিরীক্ষণ করে বললেন, 'আপনার ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক হচ্ছে খুব সম্ভবত' । তারপরেই ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের স্ত্রীকে বললেন, 'চট করে আমার প্রেসারের যন্ত্রটা নিয়ে এস তো গাড়ি থেকে'।

সদ্য বিবাহিত যুবকটি ডাক্তার হওয়ার ফলে সে যাত্রা সুরঞ্জন রক্ষা পেয়ে গেলেন বটে। অন্যথা হলে সুরঞ্জনের হেনস্থা আটকানো কঠিন হত খুব। তবে আপনি যে সর্বক্ষেত্রে হাতের সামনে একজন ডাক্তার পেয়ে যাবেন তা নয় কিন্তু। ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া কিন্তু হঠাৎ করেই হয়, প্রায় বিনা নোটিশেই। আসুন জেনে নিই এটি কি জিনিস।


ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া কি ?

মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ যদি অস্থায়ীভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় তখনই ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া হয়। টিয়ার উপসর্গগুলিও স্ট্রোকের উপসর্গের মতোই। তবে এটি ক্ষণস্থায়ী হয় এবং চরম ক্ষতি কিছু হয় না।সাধারণত টিয়াকে 'মিনি স্ট্রোক' বা 'ওয়ার্নিং স্ট্রোকও' বলা হয়ে থাকে। তাই একে একেবারেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এর অর্থ হল ভবিষ্যতে আপনার স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যদি আপনার টিয়া হয়ে থাকে তাহলে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ডাক্তার দেখানোই কিন্তু বিচক্ষণতার লক্ষণ।

কোন বয়েসে হতে পারে ?
যে কোনো বয়েসেই এই এট্যাক হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর সম্ভাবনা বেশি দেখা দেয়। পরিসংখ্যান বলছে - প্রত্যেক তৃতীয় ব্যক্তি  যাদের এই এট্যাক হয়েছে এবং চিকিৎসায় গাফিলতি করেছেন তাদের এক বছরের মধ্যেই বড় ধরণের এট্যাক হয়েছে। স্ট্রোক থেকে অর্ধেকের বেশি মৃত্যু মহিলাদের ক্ষেত্রেই ঘটে।  এছাড়াও পরিবারে কোনো সদস্যের যদি টিয়া বা স্ট্রোক হয়ে থাকে তাহলে এই এট্যাক হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এর উপসর্গ কি ?

সাধারণত ১০ - ২০ মিনিটের বেশি এর উপসর্গগুলি থাকে না। এবং সেগুলি হল -

# বিশেষ করে শরীরের একদিকে হঠাৎ নিস্তেজতা, মৃদু কম্পন, দুর্বলতা, মুখ, হাত বা পা সঞ্চালনে সমস্যা
# দৃষ্টিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন
# কথা বলায় সমস্যা
# সহজ কথা বুঝতে বিভ্রান্তি বা সমস্যা হওয়া
# হাঁটাচলা বা ব্যালান্স করতে সমস্যা
# হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই মাথাব্যথা হওয়া

কি করে হয় ?
সাধারণত মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার কারণেই এটা হয়। ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া, হার্ট এট্যাক বা হৃদপিণ্ডের অনিয়মিত ছন্দের কারণে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। যার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে বাধা পড়ে। জমাট বাঁধার মুহূর্তের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরে  উপরোক্ত উপসর্গগুলি দেখা দিতে থাকে। কখনো কখনো রক্তচাপ সাংঘাতিক হ্রাস পাওয়ার দরুনও এই এট্যাক হয়। একে 'লো ফ্লো' টিয়া বলে। তবে এই এট্যাকটি বিরল। ডাক্তাররা বলেন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেই ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা প্রবল হয়। যার ফলে অধিকাংশ সময়েই টিয়া হতে পারে। এছাড়াও আরও কারণ আছে। দেখে নিন কি কি -

# অতিরিক্ত রক্তচাপ
# ক্যারোটিড ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধলে (গলার ধমনী যা সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছয় )
# পেরিফেরাল ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধলে (হাত ও পায়ের ধমনী )
# ডায়াবেটিস
# রক্তে এমিনো এসিডের বৃদ্ধি
# অতিরিক্ত ওজন

চিকিৎসা কি ?
একজন দক্ষ নিউরোলজিস্ট বা কার্ডিওলোজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং প্রয়োজনমত সমস্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। সুবিদার্থে জানিয়ে রাখি, তিনি যে পরীক্ষাগুলি করাতে পারেন তা হল - সিটিস্ক্যান, এমআরআই, এঞ্জিওগ্রাম, ডপ্পলার আল্ট্রাসাউন্ড, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম, ব্লাড টেস্ট প্রভৃতি। তবে এতো গেল চিকিৎসকের অধীনে নিয়মমাফিক কাজ করা। আপনাকে নিজে যা যা করতে হবে তা হল -

# ধূমপান ও এলকোহল পরিত্যাগ করা
# কোলেস্টেরল ও ফ্যাট জাতীয় খাবার বর্জন করা
# প্রচুর ফল ও শাকসবজি খাওয়া
# সোডিয়াম যুক্ত বা নোনতা খাবার কম খাওয়া
# নিয়মিত শরীরচর্চা করা
# সুস্থ, স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা
# ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা

এই নিয়মগুলি পরপর মেনে চললে টিয়ার ঝুঁকি যে অনেকাংশেই কমে যায় তা বলাই বাহুল্য। নব বিবাহিতা তরুণী অবশ্য সুরঞ্জনের কাছে ভীষণ ভাবে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তীকালে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যদি ঠিক এমনটি ঘটত তাহলে তো আপনি 'টিয়া টিয়া' বলে বিখ্যাত গানটা গেয়েও পার পেতেন না। এখন কথা হচ্ছে আপনি সময় থাকতে সাবধান হবেন নাকি জোর করে বিপদ ডেকে আনবেন। পুরোটাই নির্ভর করছে আপনার ওপর।  

#healtharticle #Transientischemicattack #TIA #healthnews #GenesisHospitalKolkata #asprescribed




Monday, 23 October 2017

মাথা ব্যাথা না অন্যকিছু ?


একটা সহজ সরল আপাত নিরীহ রোগ। যে রোগটাকে অনায়াসেই আমরা হাতের পাঁচ করে দিব্যি দৈনন্দিন জীবনে পিছলিয়ে পাশ কাটিয়ে যাই। যেমন ধরুন আজ অফিস যাবো না, ছোট্ট এসএমএস - 'প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মাথা তুলতেই পারছি না'। কিম্বা বৌয়ের সাথে শপিংয়ে যেতে হবে - 'ওফ ! আজ না ভীষণ মাথা ধরেছে, তুমি একা চলে যাও প্লিজ'। অথবা অনেকদূরের কোনো নিমন্ত্রণ -  'অসহ্য যন্ত্রণায় মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, আজ ছেড়ে দিন দাদা, অন্য একদিন সময় করে গিফট দিয়ে আসব'। ইত্যাদি চেনা জানা ছকের আওতায় মাথা খেলিয়ে ডজ দেওয়াটা প্রায়শই আমাদের বেসিক স্কিলের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সত্যিই যদি একদিন পালে বাঘ পড়ে ? তাহলে ? ঘুঘু দেখতে গিয়ে যদি ফাঁদে জড়িয়ে আছাড় খেয়ে পড়েন, তখন ? ভেবে দেখেছেন কি ? তাহলে এমনই একটা সত্যি ঘটনা বলি। পেশা ও নামগুলো শুধু বদলে দিলাম। 

প্রফেসর দীনেন গুপ্ত দক্ষিণ কলকাতার একজন নামকরা শিক্ষক। পদার্থবিদ্যায় সুনামের ফলে কলেজ ও কলেজের বাইরে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা তাঁর যথেষ্ট। তাঁর স্ত্রী শ্রীমতি কল্যাণী গুপ্ত সরকারি চাকুরে। গত দেড় মাস যাবৎ কল্যাণী মাথার মধ্যে এক আশ্চর্য যন্ত্রনা অনুভব করছেন এবং সময় বিশেষে কিছু মাথাব্যথার ওষুধও খেয়ে চলেছেন। কিন্তু রোগ নিরাময় হচ্ছে না কিছুতেই। সচরাচর সাধারণ মাথাব্যথায় অধিকাংশ সময়ই আমরা ডাক্তার এড়িয়ে চলি। স্বাভাবিকভাবে কল্যাণীও তাই করেছিলেন। ছাত্রছাত্রী নিয়ে ব্যস্ত প্রফেসরও স্ত্রীর মাথাব্যথাকে যথেষ্ট গুরুত্ত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কল্যাণীর মাথাব্যথার চরিত্রও বদলাতে লাগলো একটু একটু করে। কালক্ষেপ না করে কল্যাণী চলে গেলেন তাঁর এক চেনা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে। কল্যাণীকে পরীক্ষা করে ও কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার পর ডাক্তার তাঁকে সিটি স্ক্যান করিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিলেন। যথাসময়ে রিপোর্টে দেখা গেল কল্যাণীর ব্রেনে গ্লিয়োব্লাস্টোমা মাল্টিফর্ম হয়েছে। শুনতে কতকটা এটম বোমের মত লাগলো বটে তবে সোজা বাংলা ভাষায় এর অর্থ হল - ব্রেন টিউমার। আজ্ঞে হ্যাঁ, সিনেমা সিরিয়ালে বহুল প্রচারিত যে রোগ ঠিক সেই রোগটির কথাই বলছি। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে যে অনেকসময় কেউটে বেরিয়ে আসে এইটি হল তার মোক্ষম উদাহরণ। সুতরাং সময় থাকতে থাকতে যদি একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ফেলেন তাহলে বাপ্ মায়ের দেওয়া প্রাণটা রক্ষা পায় - এই আর কি। নিচে ব্রেন টিউমারের কিছু লক্ষণ দেওয়া হল। 

লক্ষণ :
# মাথা যন্ত্রণা, সময়ের সাথে সাথে ব্যাথার তীব্রতা বৃদ্ধি
# শরীরের একাংশে বা সারা শরীরে কাঁপুনি  
# দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তিতে পরিবর্তন 
# হাতে ও পায়ে দুর্বলভাব
# মেজাজে পরিবর্তন 
# কথা বলার সময় সমস্যা 
# শারীরিক অক্ষমতা 
# স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাওয়া
# বমি ভাব 
# ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব

কিছু কিছু সময় টিউমারের স্থান অনুযায়ী নানারকম হরমোনের সমস্যা হতে পারে। যেমন অনিয়মিত মাসিক, ঊষরতা, ওজন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস। এই সমস্ত লক্ষণগুলি ধীরে ধীরে, কয়েক মাস বা বছর অথবা হঠাৎ করেও দেখা দিতে পারে। 

এর চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আর আলাদা করে আলোচনা করলাম না কারণ উপরের লক্ষণগুলি দেখা দিলে যে একজন দক্ষ স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু কয়েকটা জিনিস - 

মনে রাখবেন :
এই ধরণের মাথাব্যথা কিন্তু ভোরবেলার দিকে বেশি হয়। সুতরাং সামান্য মাথাব্যথা বলে এড়িয়ে যাবেন না। 'আমার তো মাইগ্রেন আছে, বেশি পরিশ্রম করলে একটু আধটু মাথাব্যথা হয়' - ইত্যাদি যাবতীয় ধারণাগুলির থেকে বেরিয়ে আসুন। বিশেষ করে সে ব্যথা যদি নিয়ম করে প্রায় প্রত্যেকদিনই হতে থাকে এবং তা যদি কষ্টসাপেক্ষ হয় তাহলে বলব দেরি করা মোটে ভালো কাজ না। মাথা বলে কথা, তাছাড়া ঘাড়ের ওপর তো একটাই হয়, তাই দরকার কি বাপু মাথার ব্যামো নিয়ে ঘোরাঘুরি করার। টিউমার হোক বা না হোক সময় করে একটু দেখিয়ে নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ নয় কি ?

এই বিষয়টির উপস্থাপনা কিন্তু ভয় দেখানো নয় বা মাথাব্যথা হলেই ব্রেন টিউমার হবে এমনটাও বলা নয়। বরং এই রোগটি যে হতে পারে এবং এড়িয়ে যাবার কারণে আরও জটিল হতে পারে সেই বিষয়ে আরও সাবধান করা। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন.......

#medicalarticle #braintumour #genesishospitalkolkata #asprescribed #health