Friday, 2 February 2018

সব মহিলাদের বলছি !



কিছু কিছু বিষয় প্রায় অধিকাংশ সময় পর্দার আড়ালে বা মাদুরের নিচে চাপা পড়ে থাকে। ধুলো ঝাড়ার মতো করে ঝেড়ে নিয়ে তাকে সর্বসমক্ষে নিয়ে আসার দুঃসাহস আমরা সচরাচর দেখাতে পছন্দ করি না। বিশেষ করে সে বিষয় যদি মহিলা কেন্দ্রিক হয় তাহলে তো আলোচনা করা দূর, সে প্রসঙ্গের ছায়া পর্যন্ত মাড়াই না। অথচ যখন বিপদে পড়ি তখন কিন্তু ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে  চলতে ঠিক ডাক্তারের কাছে উপস্থিত হয়ে সমস্তটা খোলসা করে বলি। তেমনই একটা বিষয় হল মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ। 

তবে এ সমস্যা আজকের নয়। জানলে হাঁ হয়ে যাবেন, ১৮০০ শতাব্দীতে কিছু পাশ্চাত্য দেশে  মহিলাদের মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ হলে বলা হত, তাদের 'মৃত্যুর দরজা' বা 'gateway to death' উন্মুক্ত হল। মেনোপজ আটকাতে গিনিপিগের ডিম্বাশয় থেকে জ্যুস বানিয়ে খেতেও দ্বিধা বোধ করতেন না সেই সময়ের মহিলারা। অবশ্য ভারতবর্ষে এমন কোনো ঘটনা ঘটত কিনা সেটা জানা নেই। তবে রক্ষণশীল দেশ হিসেবে এই বিষয়ে যে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করা যেত না সে ব্যাপারে আমরা একশোভাগ নিশ্চিত। বর্তমান যুগে সে সমস্যা খানিক মিটেছে বটে কিন্তু এহেন মোক্ষম বিষয় গোপন রাখতে আমরা কিন্তু এখনো ভালোবাসি। অনেকেরই হয়ত জানা নেই যে এই ধরণের বিষয়গুলি সঠিক জানা না থাকলে পরবর্তীকালে জটিল হবার সম্ভাবনা থাকে দ্বিগুন। তারচেয়ে আসুন সমস্যাগুলি  রাখঢাক না করে খোলাখুলি আলোচনা করে নিই। 


মেনোপজ কি ?
মেনোপজ বা ঋতুবন্ধ এমন একটি শারীরিক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একজন মহিলার ঋতুস্রাব বন্ধ হয়। মহিলাদের জীবনে এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা এবং জেনে রাখা ভালো যে এটি কিন্তু কোনোরকম রোগ বা ব্যাধি নয়। টানা বারো মাস যদি ঋতুস্রাব বন্ধ থাকে তাহলে বলা হয় সেই মহিলার ঋতুবন্ধ হয়েছে। সাধারণত ৫০ বছর বয়েসের পরেই ঋতুবন্ধ হয়ে থাকে তবে ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়েসের যে কোনো সময়ের মধ্যেও এটা ঘটতে পারে। 

মেনোপজ হওয়ার কারণ
# বয়স বাড়ার সাথে সাথে অর্থাৎ ৪০ এর কোঠায় ঢোকার মুহূর্তে একজন মহিলার শরীরে প্রজনন হরমোনের মাত্রা কমতে থাকে। কারণ, ডিম্বাশয়ের মধ্যে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের  উৎপাদন অনেকটাই হ্রাস পায় । যার ফলে মাসিকের সময়কালে হেরফের ঘটে এবং ৫০ বা ৫১ বছর বয়েসের পরই তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।  

# হিস্টেরেক্টমি এবং বাইল্যাটারাল উফরেক্টমির মাধ্যমে যদি জরায়ু এবং ডিম্বাশয় কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয় তাহলে তাৎক্ষণিক ঋতুবন্ধ হবে। স্বাভাবিকভাবে মাসিকও বন্ধ হয়ে যাবে এবং ঋতুবন্ধের উপসর্গগুলিও দেখা দেবে।  

# কেমোথেরাপি এবং রেডিয়েশন থেরাপিও ঋতুবন্ধের অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে সর্বক্ষেত্রে থেরাপির পর একেবারে মাসিক বন্ধ হয়ে যায় না।

# প্রাথমিক অপর্যাপ্ত ডিম্বাশয় - দেখা গেছে প্রায় এক শতাংশ মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪০ বছর বয়েসের আগেই ঋতুবন্ধ ঘটে। একে অকাল ঋতুবন্ধ বা প্রিমাচিওর মেনোপজ  বলা হয়। এর কারণ হল ডিম্বাশয়ের মধ্যে উপযুক্ত পরিমানে প্রজনন হরমোন তৈরী না হওয়া। সাধারণত এর কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় নি তবে চিকিৎসকদের মতে এক্ষেত্রে হরমোন থেরাপি করিয়ে নেওয়াটা ভীষণ  জরুরি, এতে মস্তিস্ক, হৃদয় এবং হাড় সুরক্ষিত থাকে।

উপসর্গ 
ঋতুবন্ধ হওয়ার আগে অর্থাৎ পেরিমেনোপজের মুহূর্তগুলিতে বেশ কিছু শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। যদিও সমস্ত মহিলাদের ক্ষেত্রে একইরকম হবে এমনটা নয় তবু সাধারণত যে উপসর্গগুলি দেখা যায় তা হল - 

# অনিয়মিত মাসিক - হঠাৎ বন্ধ হয়ে গিয়ে আবার কয়েক মাস বাদে শুরু হতে পারে 
# যোনিতে শুষ্ক ভাব 
# হট ফ্ল্যাশ - শরীরের উপরিভাগে অর্থাৎ মুখ, গলা বা বুকের অংশে গরম ভাব 
# নাইট সোয়েট - রাত্রে ঘুমোবার সময় হট ফ্ল্যাশ হওয়া
# ঘুমোনোয় সমস্যা 
# মেজাজে পরিবর্তন 
# ওজন বৃদ্ধি এবং হজমে সমস্যা 
# পাতলা চুল, শুষ্ক ত্মক এবং 
# স্তন সংকোচন হওয়া 

জটিলতা 
তবে এ পর্যন্ত যা আলোচনা করা হল, তা পড়ে অনেকেই হয়ত নাক সিঁটকোচ্ছেন আর ভাবছেন, ধুস ! এ আর নতুন কি ? এর অধিকাংশই তো জানা এবং সিলেবাসের মধ্যেই। তাহলে আপনাদের বলি যে অতটাও উদাসীন হবেন না। কারণ কিছু কিছু বিষয় আছে যা সিলেবাসের বাইরে এবং যথেষ্ট বেগ দিতে পারে এই সময়টায়। ঋতুবন্ধের কারণে বেশ কিছু জটিলতা তৈরী হয় এবং সময় বিশেষে তা মারাত্মক হতে পারে যদি না আগের থেকেই সাবধান হওয়া যায়। যেমন - 

# হৃদরোগ - ইস্ট্রোজেনের মাত্রা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে হৃদরোগের সমস্যা তৈরী হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। 

# অষ্টিওপোরোসিস -  ঋতুবন্ধের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই মহিলাদের হাড়ের ঘনত্ব কমে আসে। এর ফলে অষ্টিওপোরোসিস হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। 

# প্রস্রাবে অসংযম - ঋতুবন্ধের কারণে যোনি এবং মূত্রনালীর টিস্যুর ক্ষমতা কমে আসে। এর ফলে যখন তখন প্রস্রাব পাবার সম্ভাবনা তৈরী হয়। কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃত ভাবেও প্রস্রাব হয়ে যায়। বিশেষ করে, হাঁচি, কাশি বা অত্যধিক হাসলেও এমনটা হতে পারে। 

# স্তনের ক্যান্সার - ঋতুবন্ধের পর এই রোগ হতে পারে। তবে নিয়মিত শরীরচর্চা করলে ঝুঁকি কম থাকে। 

# যৌনতা হ্রাস - শুষ্ক যোনির কারণে যৌনমিলনে অস্বস্তি বা সামান্য রক্তপাত হতে পারে। যার ফলে যৌনমিলনে প্রবল অনিচ্ছা তৈরী হতে পারে। এক্ষেত্রে ময়েশ্চারাইজার বা লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। 

# ওজন বৃদ্ধি - ঋতুবন্ধের পর, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলাদের ওজন বেড়ে যায় তার কারণ এই সময় পাকপ্রক্রিয়া ধীরগতির হয়। সেক্ষেত্রে একটু কম পরিমাণে খেতে হবে এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করতে হবে যাতে ওজনটা একই থাকে।

চিকিৎসা 
ঋতুবন্ধে তেমন কোনো চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে যদি কোনো উপসর্গে সমস্যা দেখা দেয় তাহলে একজন দক্ষ চিকিৎসকের থেকে পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। এছাড়া নিম্নলিখিত কিছু পদ্ধতি আপনাকে স্বস্তি দিতে পারে।  

# হরমোন থেরাপি - হট ফ্ল্যাশ উপশমের জন্য ইস্ট্রোজেন থেরাপির বিশেষ কার্যকরী ভূমিকা আছে। যদি জরায়ু থাকে তাহলে ইস্ট্রোজেনের সাথে প্রোজেস্টিনেরও প্রয়োজন আছে। ইস্ট্রোজেন হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধ করে। তবে পুরোটাই নির্ভর করবে একজন মহিলার শারীরিক অবস্থা বা তার চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর।

# ভ্যাজাইনাল ইস্ট্রোজেন - এটি একটি ক্রীম, ট্যাবলেট বা রিঙের সাহায্যে যোনির শুষ্ক ভাব বা অস্বস্তি দূর করতে সাহায্য করে। এতে মূত্র সম্পর্কিত বাকি উপসর্গগুলি থেকেও উপশম ঘটে। 

# লো ডোজ এন্টিডিপ্রেস্যান্ট - হট ফ্ল্যাশ বা মেজাজ পরিবর্তনে এই এন্টিডিপ্রেস্যান্ট থেকে সুফল পাওয়া যায়। 

# গাবাপেন্টিন (নিউরোন্টিন, গ্রেলাইজ এবং অন্যান্য) - যারা ইস্ট্রোজেন থেরাপি নিতে পারেন না এবং রাতের পর রাত হট ফ্যাশের সমস্যায় ভোগেন তাদের জন্য এই ওষুধ বেশ স্বস্তিদায়ক।  

# ক্লোনিডিন - উচ্চ রক্তচাপ বা হট ফ্ল্যাশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় এই ওষুধ। 

#  অষ্টিওপোরোসিসের ওষুধ - এই ক্ষেত্রে একজন দক্ষ অর্থোপেডিকের পরামর্শ খুব জরুরি। এছাড়া নিয়মিত ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্টে নিলেও হাড় শক্ত হবে। 

ঋতুবন্ধ অত্যন্ত সহজ সাধারণ হলেও এর উপসর্গ বা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া অনেক সময়ই চিন্তার কারণ হয়ে ওঠে। এসমস্ত ক্ষেত্রে অবস্থা জটিলতর হলে ঝঞ্ঝাটের শেষ থাকে না। যদিও এই অবস্থা বাস্তবে এড়ানো সম্ভব নয় তবু এর উপসর্গ থেকে অন্তত কিছুটা হলেও উপশম পাওয়া যায়, যদি উপরোক্ত বিষয়ের ওপর মনোযোগী হন তবেই। তাই আপনার বয়স যদি ৪০ পেরিয়ে গিয়ে থাকে তাহলে বলব নিজের শরীরের প্রতি আরেকটু যত্ন নিন। কালের গর্ভে কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের জন্য আমরা কেউই জানি না। তার চেয়ে আগের থেকেই সাবধান হই বরং, কি বলেন ? 

#medicalarticle #healtharticle #menopause #hotflash #nightsweat #oldageproblems #GenesisHospitalKolkata #AsPrescribed


Tuesday, 30 January 2018

তিল থেকে তাল

কথায় বলে বিউটি স্পটের কদরই আলাদা। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে একপ্রকার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বলা যেতে পারে। মুখে যাদের বিউটি স্পট আছে তারা যে রাস্তাঘাটে অতিরিক্ত মনোযোগ পেয়ে থাকেন এ হয়ত না বললেও চলবে। ভুবনমোহিনী হাসির অন্তরালে যার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি তার দিকে বরং আরেকটু লক্ষ্য রাখুন। খেয়াল করে দেখুন তো এই বিউটি স্পটের বিউটি চিরকাল একইরকম থাকছে কিনা ? অর্থাৎ যে স্পট বা  তিলটি সৌন্দর্যের মূল উপাদান সেইটি কোনোরকম আকারে পরিবর্তন হল, নাকি তার বর্ণের কোনোরকম বিসদৃশ ঘটল ! তা যদি হয়ে থাকে তাহলে চিকিৎসকের কাছে ছুটে যান এক্ষুনি। মেলানোমা নামক ত্মকের একটি ভয়ানক ক্যান্সার হতে পারে। এই রোগের কথা আগে না শুনে থাকলে, আজই জেনে নিন এর হাল হকিকত।  

মেলানোমা কি ?
খুব প্রচলিত না হলেও ত্মকের এই ক্যান্সারটি অত্যন্ত মারাত্মক কারণ এটি সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির প্রভাবে কিছু জেনেটিক সমস্যা তৈরী হয়। যার ফলে ত্মকের কোষগুলি দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করে এবং ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে পরিণত হয়। এই টিউমারগুলি তৈরী হয় এপিডার্মিসের বেসাল লেয়ারে। ত্মকের যে কোনো জায়গায় হতে পারে এই রোগ। মেলানোমা কতকটা তিলের মতো দেখতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে আবার তিল থেকেই শুরু হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেলানোমা কালো বা বাদামী রঙের হয়। আবার কখনো কখনো গোলাপী, লাল, বেগুনি বা সাদা রঙেরও হতে পারে। প্রধানত ইউভি (UV) রশ্মির তীব্রতার কারণেই ত্মকে মেলানোমা হয়। 

তবে কি আশার আলো একেবারেই নেই ? হ্যাঁ আছে। প্রাথমিক পর্যায়ে যদি মেলানোমা ধরা পড়ে এবং চিকিৎসা হয় তাহলে প্রায়ই সেড়ে যায়। তা যদি না হয় তাহলে এই ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। 

কত রকমের হয় এই রোগ ?
মেলানোমা সাধারণত চার রকমের হয়। 
#  সুপার ফিসিয়াল স্প্রেডিং মেলানোমা - এটি বেশ প্রচলিত। সাধারণত বুক, পেট, পিঠ বা হাতে পায়ে দেখা যায়।

# নোডিউলার মেলানোমা - বুক, পিঠ, মাথা বা গলার দিকে হয়। অপেক্ষাকৃত দ্রুত বৃদ্ধি ঘটে এই রোগের এবং ধীরে ধীরে লাল হতে থাকে। 

# লেন্টিগো ম্যালাইনা মেলানোমা - বয়স্কদের ক্ষেত্রে এর প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে শরীরের সেই সমস্ত জায়গাতে হয় যা বহু বছর ধরে সূর্যের রশ্মিতে উন্মুক্ত থাকে। প্রথমে একটা দাগের মতো হয়, সময়ের সাথে ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। তুলনামূলক ভাবে এটি কম বিপজ্জনক।

# এক্রাল লেন্টিজিনাস মেলানোমা - এই রোগটি বিরল। সাধারণত এটি দেখা যায় হাতের চেটোয়, গোড়ালির নিচে অথবা নখের তলায়। এর সাথে ত্মকের বর্ণ বা সূর্যের রশ্মির কোনো সম্পর্ক নেই।

এই রোগ হওয়ার কারণ কি ?
কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরণের ত্মকে মেলানোমা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নিম্নলিখিত কারণের ফলে এই রোগ হতে পারে। 
# ছোট ছোট প্যাচ হওয়া বা সূর্য রশ্মির কারণে সেই প্যাচ গাঢ় হওয়া। 
# প্রচুর তিল হওয়া 
# সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের তিল হওয়া 
# ছোট ছোট বাদামী রঙের স্পট বা বয়সজনিত কোনো স্পট দেখা দেওয়া 
# এমন ত্মক যা সহজেই রোদে পুড়ে যায়
# অতিরিক্ত সময় ধরে সূর্যের রশ্মিতে উন্মুক্ত থাকা  
# পরিবারের কোনো সদস্যের মেলানোমা হওয়া বা 
# যদি কোনো অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়ে থাকে

এর উপসর্গ কি কি ?
অন্যান্য ক্যান্সারের মতোই মেলানোমার প্রাথমিক স্টেজ শনাক্ত করা মুশকিল হতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে ত্মকে কোনোরকম পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে কিনা। যেমন - 
# নতুন কোনো স্পট বা তিল হওয়া অথবা পুরোনো তিলের বর্ণ বা আকারে কোনো পরিবর্তন 
# ত্মকের কোনো সমস্যা সহজে ঠিক না হওয়া  
# কোনো স্পটে ব্যাথা হওয়া বা রক্তক্ষরণ হওয়া 
# কোনো স্পট অতিরিক্ত উজ্জ্বল, মসৃণ বা ম্লান হওয়া, অথবা 
# কোনো অদ্ভুত দর্শন শক্ত লাল পিণ্ড যার থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে 

কিভাবে বুঝবেন ?
এবিসিডিই (ABCDE) টেস্টের মাধ্যমে মেলানোমার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। নিচে বিশদে দেওয়া হল। 
# এসিমেট্রিক - সাধারণ তিল, গোল বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। ক্যান্সারাস তিল কিন্তু গোল বা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না। অর্থাৎ তিলটির দুদিক একইরকম দেখতে নয়। 
# বর্ডার - তুমলমূলক ভাবে অমসৃণ বা ঝাপসা হবে।  
# কালার - বিভিন্ন বর্ণের হতে পারে, যেমন - কালো, বাদামী, সাদা বা নীল। 
# ডায়ামিটার - তিলের আকারে পরিবর্তন বা সাধারণ তিলের থেকে বড় হলে ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। 
# ইভলভিং - কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই যদি তিলের চেহারায় পরিবর্তন আসে তাহলেও ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। 

চিকিৎসার উপায় 
অন্যান্য ক্যান্সারের তুলনায় এর চিকিৎসা খানিকটা সহজ কারণ এর সম্পূর্ণ অপসারণ সম্ভব। মেলানোমার অত্যন্ত প্রচলিত চিকিৎসা হল সার্জারি। অস্ত্রপচারের মাধ্যমে ক্ষতস্থান ও চারপাশের টিস্যু অপসারণ করা হয়। যদি ত্মকের অনেকটা জায়গা জুড়ে হয় তাহলে স্কিন গ্রাফটিংয়ের মাধ্যমে নির্মূল করা হয়। এছাড়া স্কিন ক্যান্সারের অন্যান্য সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিগুলি হল - কেমোথেরাপি এবং বায়োলজিক্যাল থেরাপি। বিরল ক্ষেত্রে ফোটোডায়নামিক থেরাপিও করা হয়। 

সুতরাং মেলানোমার জন্য দরজা খোলা না রেখে আমাদের প্রতিরোধের দিকে মন দেওয়াটাই বেশি প্রয়োজন। অতিরিক্ত রোদ বা সূর্যের তাপ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলুন। বলাই বাহুল্য ব্যাগে সানস্ক্রিন রাখতে হবে এবং সরাসরি সূর্যের আলো থেকে শিশুদের দূরে রাখুন। মেলানোমার কবল থেকে বাঁচতে নিজেকেই প্রাথমিক ধাপটা নিতে হবে, জানবেন, বিপদ কিন্তু ওত পেতেই আছে। তাই আগের থেকেই সাবধান হন।

#melanoma #skincancer #GenesisHospitalKolkata #AsPrescribed #bengalihealtharticle #medicalarticle #health 

Friday, 12 January 2018

দিনের শেষে ঘুমের দেশে

(Audio File)
https://soundcloud.com/user-298724335/fz5bc3sdjgnc 


ঘুম বড় আশ্চর্য জিনিস। পেলে একরকম না পেলে আরেকরকম। যখন তখন ঘুমিয়ে পড়াও যেমন ঠিক নয় তেমনি ঘুমকে অবজ্ঞা করাও মোটে উচিত নয়। ট্রামে, বাসে বা ট্রেনে যদি আপনি মখমলি কাঁধ পেলেই চোখ বোজার সুযোগ খোঁজেন তাহলে বলতে হবে আপনি ঘুমের অভাবে ভুগছেন অথবা ঐটে আপনার ভীষণ রকম বদভ্যেস। সেটা যদি না হয় তাহলে চট করে পড়ে ফেলুন ঘুমের অভাবে কি কি হতে পারে। 

ঘুমের অভাবে কি হতে পারে ?
ঘুমের অভাবে নানান রকম সমস্যা তৈরী হয়। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেসব সমস্যা জটিলতর হতে থাকে অচিরেই। এক্ষেত্রে প্রথমেই যার কথা বলতে হয় তা হল স্মৃতি। ভীষণ রকম স্মৃতিজনিত সমস্যা হতে পারে। যাঁরা গান ভালোবাসেন তাঁদের, 'তোমার গীতি জাগালো স্মৃতি' - রবিঠাকুরের এই গানটি আর নাও মনে আসতে পারে। মুচকি হেসে ভাবছেন, 'যাহ ! রবিঠাকুর ভুলে যাব ! তাই আবার কখনো হয় নাকি' ! তাহলে একটি সরল, ছোট্ট ব্যাখ্যা দিই। আসন্ন বিপদটা বুঝতে সুবিধে হবে আপনার। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে আপনার ইমেল্ ইনবক্সের মতো মস্তিষ্কেরও একটি স্মৃতির ইনবক্স থাকে। ঠিকঠাক ঘুম না হলে এই ইনবক্সটি আপনা আপনিই বন্ধ বা শাট ডাউন হয়ে যায়। যার ফলে নতুন করে কোনোরকম স্মৃতি তৈরী হতে পারে না। আপনার স্মৃতিবিলোপ হতে থাকে খুব তাড়াতাড়ি। দাঁড়ান, এখানেই শেষ নয়।  

এছাড়া আরও একটি সমস্যা আছে। ঘুমের অভাবে একটি বিষাক্ত প্রোটিন তৈরী হয় যার নাম হল 'বিটা এমিলয়েড'। এই প্রোটিন তৈরীর ফলে আপনার মারাত্মক রকমের স্মৃতি সংশয় হতে পারে, ডাক্তারি পরিভাষায় যার নাম - আলঝেইমার্স ডিজিজ। ঘুমোনোর সময় আপনার মস্তিষ্কে একটি নিকাশী ব্যবস্থা সচল হয়ে ওঠে। যার মাধ্যমে এই 'বিটা এমিলয়েড' ধুয়ে সাফ হয়ে বেরিয়ে যায়। সুতরাং ঘুমের অভাব কিন্তু অজান্তেই আপনার মস্তিষ্কে তৈরী করবে এই আলঝেইমার্স প্রোটিন। যত বেশি মাত্রায় এই ক্ষতিকারক প্রোটিন তৈরী হবে ততটাই দ্রুত আপনি স্মৃতিভ্রংশ হবেন। "ম্যায় কাঁহা হুঁ" ? এই ধরণের প্রশ্ন আপনার মুখ থেকে বেরিয়ে আসাটা কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। সুতরাং 'ঘুমিয়ে কি কেউ বড়লোক হতে পেরেছে' ? - এই বেদবাক্যে যদি আপনি বিশ্বাসী হন তাহলে কোন কোন রোগকে আগাম পান সুপুরি দিয়ে নিমন্ত্রণ দিচ্ছেন তা একবার নিচের লেখায় চোখ বুলিয়ে নিলেই জানতে পারবেন।   

শরীরের ওপর কি কি প্রভাব পড়ে  ?
শরীরের ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যাঁরা ইচ্ছে করে রাত জাগেন বা অনিদ্রাজনিত সমস্যায় ভোগেন তাঁরা হয়ত জানেন না যে অজান্তেই আপনারা শরীরের মধ্যে ডেকে আনছেন অবাঞ্ছিত বিপদ। পরবর্তীকালে যে বিপদ আপনাদের প্রাণ সংশয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তখন হয়ত বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাবে। তাই আগের থেকেই জেনে রাখুন নিম্নলিখিত বিপদের তালিকা এবং প্রয়োজনমত ব্যবস্থা নিন এখন থেকেই।

# প্রজনন প্রক্রিয়ায় এর যথেষ্ট প্রভাব পড়ে। যে সমস্ত পুরুষরা ৫ থেকে ৬ ঘন্টা ঘুমোন তাদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা তুলনামূলক ভাবে বেশ কম হয়। ঘুমের অভাবে কিন্তু তাদের পুরুষত্ব হ্রাস পাবার সম্ভাবনা সাংঘাতিক রকম বেশি। 

# রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব মারাত্মক। যাঁরা ৪ থেকে ৫ ঘন্টা ঘুমোন তাঁদের এন্টি ক্যান্সার রোগ প্রতিরোধক কোষের সংখ্যা ৭০ শতাংশ হ্রাস পায়। এছাড়া অন্য আরও ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকে প্রবল। যেমন অন্ত্রের ক্যান্সার, প্রস্টেট ক্যান্সার এবং স্তনের ক্যান্সার। সম্প্রতি হু (WHO), রাত্রিকালীন  শিফটের কাজগুলিকে ক্যান্সারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

# এছাড়া কার্ডিওভাসকুলার সিস্টেমের ওপরেও বিশেষ প্রভাব পড়ে। এখানে জেনে রাখা ভালো যে ঘুমোনোর সময়তেই আমরা কিন্তু রক্তচাপের ওষুধ সঞ্চয় করি। আশ্চর্য হচ্ছেন ? আমাদের হয়তো অনেকেরই এই সহজ তথ্যটি জানা নেই যে ঘুমোনোর সময় হৃদ কম্পন ধীরগতির হয় যার ফলে রক্তচাপ হ্রাস পায়। জানা গেছে যে ৬ঘন্টা বা তার কম সময়ে ঘুমের দরুন হার্ট এট্যাক বা স্ট্রোকের সম্ভাবনা থাকে ২০০ শতাংশ।  সুতরাং পরিমিত ঘুম, সুস্থ হৃদয়ের অন্যতম কারণ। 

বছরে দুবার প্রায় ১৬ কোটি মানুষের ওপর বিশ্বব্যাপী একটি পরীক্ষা করা হয় যার নাম হল ডেলাইট সেভিং টাইম। এই পরীক্ষায় দেখা গেছে যে একদিন এক ঘন্টা কম ঘুমোনোর ফলে তার পরের দিনে ২৪ শতাংশ হার্ট এট্যাক বেড়েছে। এমতাবস্থায় খুব স্বাভাবিকভাবে একটি প্রশ্ন উঠে আসে। 

ঘুম ছাড়া কতক্ষন পর্যন্ত আমাদের মস্তিস্ক সঠিক ভাবে কাজ করতে পারে ?
উত্তর হল - ১৬ ঘন্টা। তারপরেই মানসিক ও শারীরিক অবনতি ঘটে। কতকটা গাড়ির স্টিয়ারিঙ ধরে  নেশাগ্রস্ত অবস্থায় চালানোর মতো। অতএব জেগে থাকার ক্ষতি মেরামতির জন্য অন্তত পক্ষে ৮ ঘন্টার ঘুম অতি আবশ্যক। তাই এরপরেও যদি আপনার মনে হয় রাত জেগে আরও কিছুক্ষন লুডো খেলে নি, যা আপনি খেলতেই পারেন কিন্তু পরের দিনে আপনাকে না ছক্কা পুটের মাশুল গুনতে হয় সে ব্যাপারে কিন্তু অবশ্যই খেয়াল রাখবেন। বাকি আপনি দিনের শেষে ঘুমের দেশে যাবেন না অন্য কোথাও সে আপনার একান্তই ব্যক্তিগত।

courtesy : Prof. Matthew Walker, Neuroscience and Psychology, University of California, Berkeley

#sleepdisorders #sleepproblems #lackofsleep #AsPrescribed #GenesisHospitalKolkata


Saturday, 6 January 2018

হাত জড়ালেই বন্ধু


আজকের দুপুরটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। সারা বছরের মুহূর্তগুলো জমাট বাঁধা হয়ে আছে এক অমূল্য ক্ষণে। যে ক্ষণের অপেক্ষায় সৌভিক দিন গুনেছে সময়ের পর সময়ের হাত ধরে। অবশেষে পৃথা সায় দিয়েছে। সায় দিয়েছে কিছু মুহূর্ত একসাথে কাটাবার, কিছু উষ্ণতা একসাথে ভাগ করে নেবার। দুদিন আগে টেলিফোনে যখন সৌভিক ডায়াল করেছে পৃথার নাম্বারটা তখন পৃথা জানতই না সৌভিক তাকে দেখা করার কথা বলবে। জানত না গঙ্গার ধারে আপাত নিরিবিলি, ছিমছাম এক রেস্তরাঁর বুকে আঁকা হবে কত দিনবদলের স্বপ্ন। তাই আধঘন্টা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল সৌভিক। পৃথা অবশ্য দেরি করেনি খুব বেশি। যথাসময় পৌঁছে টিউশন ক্লাসের ব্যাচমেট সৌভিকের চোখে চোখ রেখেছিল। ইশারায় জিজ্ঞেস করেছিল এমন তলবের কারণ। যদিও মনে মনে পৃথা জানত কারণটা, তবুও নিজের কানে শোনার লোভটুকু বিসর্জন দিতে পারেনি সে। পৃথার সমস্ত পছন্দসই খাবার অর্ডার করে অনুরাগের গল্পে মেতে উঠেছিল দুজনে। 

সবটাই নিজস্ব নিয়মে চলছিল। কিন্তু তীরে এসে যে তরী ডোবার উপক্রম হবে একথা বোধহয় একমাত্র ঈশ্বরই জানতেন। সৌভিক হয়ত একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছিল। খাবার শেষ হওয়ার আগেই বলে ফেলেছিল তার হৃদয়ের গোপন আর্তিগুলো। অকপটে ছুঁয়ে ফেলেছিল ভালোবাসার স্পন্দন। অকস্মাৎ বিষম খেয়েছিল পৃথা। আর তাতেই কাল হল। মাংসের টুকরো গলায় আটকে দমবন্ধ হবার উপক্রম হল প্রায়। দুপুরের নৈকট্য টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে। দম আঁটকে অচৈতন্য হবার মুহূর্তে সৌভিক ধরে ফেলে পৃথাকে। বায়োলজির সুযোগ্য ছাত্র সৌভিক, হেমলিচ ম্যানুয়েভারের বিশেষ কায়দায় পৃথার পেটে চাপ দিয়ে গলা থেকে বের করে আনল মাংসের টুকরোটা। এক লহমা দম নিয়ে পৃথা জাপটে ধরেছিল সৌভিককে। আসন্ন মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এসে  থরথর করে কেঁপে উঠেছিল সে। সে যাত্রা জোর বেঁচেছিল পৃথা আর হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিল রেস্তোরাঁর বাকি লোকজন। এই হেমলিচ ম্যানুয়েভারের বিশেষ কায়দাটি কি, সেটা আসুন একটু জেনে নিই।   

হেমলিচ ম্যানুয়েভার কি ?
হেমলিচ ম্যানুয়েভার হল একটি প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতি। শ্বাসনালীতে আটকে থাকা কোনো খাবারের টুকরো বা অন্য কোনো বস্তু বের করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ১৯৭৪ সালে ডঃ হেনরী হেমলিচ এই পদ্ধতিটি প্রথম প্রদর্শন করেন। ওনার নামানুসারেই এই পদ্ধতির প্রচলন শুরু হয়।জরুরী অবস্থায় এই পদ্ধতিটি কিভাবে প্রয়োগ করবেন তা জানতে হলে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলি অনুসরণ করুন।


চোকড হবার সময় কি করবেন ?
যে ব্যক্তিটি চোকড হচ্ছেন তাঁর কথা বলা বা শ্বাস নেওয়ার ক্ষেত্রে ভীষণ সমস্যা হতে পারে। এই সময় যা করতে হবে তা হল -
# ব্যক্তিটির পিছন দিক দিয়ে কোমরের চারপাশে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরুন।
# একহাতে মুঠো বন্ধ করে, আপনার বুড়ো আঙুলের দিকটা ব্যক্তিটির পাঁজরের নিচে অর্থাৎ পেটের ওপরের দিকে চেপে ধরুন।
# অন্য হাত দিয়ে সেই মুঠো চেপে ব্যক্তির পেটের উপরিভাগে জোরে চাপ দিন। কিন্তু খেয়াল রাখবেন এই চাপ যেন পাঁজরের ওপর কখনই না পড়ে।
# এই পদ্ধতিটি বারে বারে করতে থাকুন, যতক্ষণ না খাবারের টুকরো বা বস্তুটি মুখ দিয়ে বেরিয়ে না আসে।
# মনে রাখবেন কখনোই যেন পিঠে চাপড় মারবেন না। তাতে কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে।


যখন ব্যক্তিটি অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন তখন কি করবেন ?
# প্রথমে তাকে চিৎ করে শোয়ান। 
# এরপর ব্যক্তিটির কোমরের দু দিকে হাঁটু মুড়ে বসুন।
# একটা হাতের ওপর আরেকটা হাত রেখে ব্যক্তিটির পেটের ওপর দিকে অর্থাৎ পাঁজরের নিচে চেপে ধরুন।
# তারপর দুহাত একই ভাবে রেখে দ্রুত চাপ দিতে থাকুন।
# বস্তুটি বের না হওয়া পর্যন্ত একই ভাবে করতে থাকুন। এক্ষেত্রেও পিঠে চাপড় মারতে যাবেন না কিন্তু।


শিশুদের ক্ষেত্রে কি করবেন ?
# শিশুটিকে শক্ত জমির ওপর শুইয়ে দিন। অথবা নিজের কোলে নিয়েও বসাতে পারেন।
# আপনার দুহাতের তর্জনী ও মধ্যমা এক সাথে শিশুটির পাঁজরের নিচে এবং নাভির ওপর রাখুন।
# এরপর ওই অবস্থায় দুহাতের আঙ্গুল দিয়ে একসাথে পেটের উপরিভাগে চাপ দিতে থাকুন।
# বস্তুটি বের না হওয়া পর্যন্ত এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে থাকুন।
# তবে খুব সাবধানে করবেন, পাঁজরে যেন কোনোভাবেই চাপ না পড়ে।

নিজের ক্ষেত্রে হলে কি করবেন ? 
# এক হাতে মুঠো বন্ধ করে, মুঠোর বুড়ো আঙুলের দিকটা আপনার পাঁজরের নিচে অর্থাৎ পেটের ওপরের দিকে চেপে ধরুন।
# তারপর অপর হাত দিয়ে সেই মুঠো চেপে পেটের উপরিভাগে জোরে চাপ দিন।
# বস্তুটি না বেরোনো অবধি এটি করতে থাকুন।
# এছাড়া আপনি কোনো চেয়ার, টেবিল বা শক্ত কিছুর ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়াতে পারেন।
# আপনার পেটের উপরিভাগ দিয়ে সেই শক্ত বস্তুটির ওপর ক্রমাগত চাপ দিতে থাকুন। এক্ষেত্রেও বস্তুটি শ্বাসনালী থেকে না বেরোনো অবধি বারে বারে করুন। 

ওপরের যে কোনো ক্ষেত্রে যদি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয় তাহলে অবিলম্বে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে এটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। উপরোক্ত ঘটনায় সৌভিক অনন্য গিফ্ট পেয়েছিল পৃথার থেকে। কারণ, এমন আশ্চর্য প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে পৃথা শুধু মোহিতই হয়নি, তার বন্ধুর হাত ধরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার পরে পরেই। তবে জীবনবিজ্ঞানের ছাত্র বা ছাত্রী আপনি যদি নাও হন তবুও নিকট আত্মীয়ের বিপদের সময় হাত বাড়ানোটাই কিন্তু উপযুক্ত বন্ধুত্বের পরিচয়। হেমলিচ ম্যানুয়েভার পদ্ধতির সামান্য কয়েকটি ধাপ মাত্র, শিখে রাখতে ক্ষতি তো কিছু নেই, কে জানে কখন কোথায় কিভাবে কাজে লাগে, তাই না ? 

#Heimlichmaneuver #abdominalthrust #bengalihealtharticle #firstaid #emergencytreatment  #AsPrescribed

Thursday, 7 December 2017

কণ্ঠের কণ্টক


"হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে" - উত্তর কলকাতার ডাকসাইটে উকিল সুধীর গাঙ্গুলি এই লাইনটিকে প্রায় বেদবাক্যের মতো মেনে চলেন। কোনোরকম আইনি মামলা হোক বা সামাজিক ইস্যু, আন্তর্জাতিক ঘটনা থেকে পাড়ার হাইড্রেন আঁটকে যাওয়ার মতো যে কোনো বিষয়ে সুধীরবাবু তাঁর উচ্চকণ্ঠের প্রতিধ্বনিতে নিজস্ব বক্তব্য রাখতে অত্যন্ত ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন গান বাজনা, শিক্ষকতা, রাজনীতি এবং ওকালতি, এই সমস্ত পেশায় গলার জোর যদি না থাকে তাহলে জনগন কিছুতেই আপনাকে পাত্তা দেবে না। মিনমিন করা মানুষদের সুধীরবাবু মোটেই দুচক্ষে দেখতে পারেন না। 

এহেন সুধীরবাবু কোনো এক শীতের ভোরবেলায় উঠে দেখলেন তাঁর গলা দিয়ে ঘড়ঘড়ে হাওয়া ছাড়া আর কোনোরকম আওয়াজই বেরোচ্ছে না। আঁতকে উঠলেন তিনি। চোখের সামনে ভেসে উঠল তিনি কোর্টের মধ্যে হাত মুখ নাড়িয়ে কতকটা ইশারাতেই একের পর এক কেস লড়ছেন আর হেরে যাচ্ছেন। একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে তিনি বাড়ির সমস্ত লোককে ধরে ধরে বোঝাবার চেষ্টা করলেন যে তিনি বোধহয় বোবা হয়ে যেতে বসেছেন। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির লোকজন প্রায় হাঁপ ছেড়ে বাঁচবার জোগাড় করছিলেন। কিন্তু সেসমস্ত চিন্তা ভাবনাকে দূরে সরিয়ে তৎক্ষণাৎ তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল একজন ইএনটি স্পেশালিস্টের কাছে। সমস্তটা দেখে শুনে তিনি বললেন উকিলবাবুর  টন্সিলাইটিস হয়েছে। সুধীর গাঙ্গুলি তাঁর কণ্ঠরোধের আশঙ্কায় মুষড়ে পড়লেন প্রায়। কি এমন রোগ হল ? আসুন জেনে নিই। 

টন্সিলাইটিস কি ?
গলার পিছন দিকে যে দুটি লিম্ফ্ নোড থাকে তাদেরকেই টন্সিল বলে। টন্সিল, শরীরকে সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে। মুখের মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করা ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাস প্রতিরোধে টন্সিলের কার্যকরী ভূমিকা রীতিমত উল্লেখযোগ্য। এই টন্সিলে যখন কোনো সংক্রমণ হয় তখন তাকে টন্সিলাইটিস বলে। এই রোগটি সাধারণত শিশুদের হয়ে থাকে এবং যথেষ্ট সংক্রামকও বটে। কিছু সাধারণ ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসের কারণে স্ট্রেপ থ্রোট হয়। এই স্ট্রেপ থ্রোট থেকেই টন্সিলাইটিসের জন্ম। তবে সময়মত চিকিৎসা না করলে পরবর্তীকালে এই রোগের জটিল আকার ধারণ করার বিলক্ষণ সম্ভাবনা থেকে যায় কিন্তু। তাই বলে সাংঘাতিক ভয়ের কিছু নেই কারণ টন্সিলাইটিস চিহ্নিত করা যায় খুব সহজেই। এর নানান উপসর্গগুলি নিম্ন লিখিত দেওয়া হল।

উপসর্গ 
# গলা ফুলে যাওয়া এবং অসম্ভব ব্যাথা হওয়া
# খাবার গিলতে সমস্যা বা ব্যাথা হওয়া
# মুখে গন্ধ
# জ্বর
# ঠাণ্ডা লাগা
# কানে ব্যাথা
# ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
# টন্সিল লাল হওয়া বা ফুলে যাওয়া
# টন্সিলে সাদা বা হলুদ স্পট দেখা দেওয়া

কার হতে পারে এই রোগ ?
সাধারণত শিশুদের হলেও লিঙ্গ নির্বিশেষে যে কোনো বয়েসের মানুষের টন্সিলাইটিস হতে পারে। স্ট্রেপ টেস্ট বা ব্লাড টেস্টের মাধ্যমে এই রোগ নিশ্চিত করা হয়।

কত রকমের টন্সিলাইটিস হয় ?
সাধারণত তিন রকমের হয়।
# একিউট টন্সিলাইটিস - সাধারণ টন্সিলাইটিসেরই নামান্তর। উপরোক্ত উপসর্গগুলি দেখা যায় এক্ষেত্রে।
# রেকারেন্ট টন্সিলাইটিস - সারা বছর ধরে একাধিকবার এই রোগ হয়।
# ক্রনিক টন্সিলাইটিস - সাধারণ টন্সিলাইটিসের থেকে অনেক বেশি জটিল হয় এই রোগ। এর উপসর্গগুলি হল প্রচণ্ড গলা ব্যথা হওয়া বা ফুলে যাওয়া, মুখে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিস হওয়া।

এর চিকিৎসা কি ?
খুব সাধারণ টন্সিলাইটিস হলে বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে না। দু তিন দিনের মধ্যে এমনিই সেরে যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে রোগ যখন জটিল হয় তখন কিন্তু এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজন পড়ে। একজন দক্ষ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এন্টিবায়োটিক খাওয়া উচিৎ এবং সম্পূর্ণ কোর্স করাই বাঞ্ছনীয়।
সাধারণ টন্সিলাইটিস হলে প্রচুর পরিমানে জল খেতে হবে ও উষ্ণ লবন জলে নিয়মিত গার্গল করলে অনেকটাই উপশম ঘটবে। এছাড়া জলে বিটাডিন সল্যুশন মিশিয়ে গার্গল করলেও দিব্যি উপকার পাবেন। 

সার্জারির সাহায্যেও টন্সিলাইটিস নিরাময় করা হয়। এই পদ্ধতিকে বলে টন্সিলেক্টমি। এই পদ্ধতি একসময় বহুল প্রচারিত ছিল। তবে বর্তমানে যে রুগীর ক্রনিক বা রেকারেন্ট টন্সিলাইটিস হয়, তাদের ক্ষেত্রেই সার্জারির প্রয়োজন পড়ে। আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোবলেশন টেকনোলজি উপস্থাপিত হওয়ার পর বলা যেতে পারে এই সার্জারিতে অনন্য বিপ্লব ঘটেছে। দুর্দান্ত পরিবর্তন এনেছে এই যুগান্তকারী পদ্ধতি। তার কারণ, অন্যান্য টন্সিলেক্টমি পদ্ধতির তুলনায় কোবলেশন টেকনোলজিতে খুব সামান্যই ব্যাথা হয়, রক্তক্ষরণের সম্ভাবনাও অনেক কম থাকে এবং চিকিৎসকরাও অত্যন্ত সহজ ভাবে এই সার্জারি সম্পন্ন করতে পারেন। যার ফলে রুগীরা অনেক দ্রুত স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে আসতে পারেন। বাকি পদ্ধতির তুলনায় সার্জারির পরবর্তী জটিলতাও অনেকটাই কম এক্ষেত্রে।

এই কোবলেশন টেকনোলজি কলকাতার বুকে বিরল। তবে সম্প্রতি জেনেসিস হসপিটালে এমনিই একটি ব্যায়বহুল কোবলেশন টেকনোলজি স্থাপন করা হয়েছে। যার দ্বারা এখন বহু সার্জারি অপেক্ষাকৃত কম সময় ও বিনা জটিলতায় সম্পন্ন করা হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই রুগীরা সেরে উঠছেন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই। 

সুধীরবাবুর কিন্তু কদিন ধরেই ঘুসঘুসে জ্বর, খুসখুসে কাশি ইত্যাদি সমস্তরকম উপসর্গ দেখা দিচ্ছিল। কিন্তু সেসব সামান্য ইতর বিশেষ রোগজ্বালাকে তিনি চিরকাল একফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে এসেছেন। তাই অবহেলায় ও অজান্তে তিনি এমন এক রোগ ডেকে আনলেন যা তাঁর কণ্ঠরোধের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াল। আপনার ক্ষেত্রে এই ধরণের যদি কোনো উপসর্গ দেখা দেয় তাহলে কিন্তু অসময়ে বীর হওয়ার চেষ্টা করবেন না। অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন অথবা জেনেসিস হসপিটালের স্পেশালিস্ট ইএনটি ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করুন যার ঠিকানা এখানেই পেয়ে যেতে পারেন প্রায় বিনা কসরতে। 

#healtharticle #tonsillitis #tonsillectomy #coblation #healthnews #GenesisHospitalKolkata #asprescribed

Thursday, 23 November 2017

মিনি স্ট্রোক


ডায়মন্ড হারবারের শেষ মাথায় একটি জনপ্রিয় হোটেলের মালিক সুরঞ্জন চৌধুরী। যেমন সাজানো গোছানো পরিবেশ ততোধিক উপাদেয় পঞ্চব্যঞ্জন। গঙ্গার পারে ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে এই হোটেলে লাঞ্চ বা ডিনার সেরে নেওয়াটা অধিকাংশ ট্যুরিষ্টেরই পছন্দেরই তালিকায় থাকে। গোলগাল, অমায়িক সুরঞ্জনের ব্যবহার ও আপ্যায়নে অতিথিরা দিব্যি মজে থাকেন। বহু বছরের পুরোনো হোটেলটি যে ঐতিহ্য ও খ্যাতিতে অন্যান্য হোটেলগুলির থেকে কয়েক কদম এগিয়ে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ নিয়ে ষাটোর্দ্ধ সুরঞ্জন গর্বও করেন বেশ। কিন্তু তাঁর গর্বের ফানুশ যে হাওয়ায় দুলতে দুলতে একেবারে গঙ্গার ঘাটে সলিল সমাধি ঘটাবে তা আর কে জানত ! কি হল ? শুনুন তাহলে।

কোনো এক বসন্তের সন্ধ্যায় এক সদ্য বিবাহিত তরুণ তরুণী প্রেমের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে একটি রুমের সন্ধানে উপস্থিত হলেন সুরঞ্জনের হোটেলে। সুরঞ্জন মিষ্টি হেসে তাদের আপ্যায়ন করলেন ও অনতিদূরেই একটি সোফায় বসালেন। অফিসিয়াল ফর্মালিটি সারতে সারতে কতকটা আকস্মিক ভাবেই সুরঞ্জনের বাঁদিকের চোখ ও মুখ নাচতে লাগল। দূর থেকে দেখে নব পরিণীতা বধূ মনে করলেন, সুরঞ্জন বুঝি তাকে অশালীন ইঙ্গিত করছেন। প্রথমটায় তিনি তেমন পাত্তা দিলেন না। কিন্তু  কেলেঙ্কারির আরো কিছুটা বাকি ছিল। যখন কিছুক্ষন বাদে বাদেই আবার সুরঞ্জনের চোখ মুখ সমান তালে নড়তে লাগল তখন তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। উঠে এসে ঠাস করে এক চড় মেরে সুরঞ্জনকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কি ইতর লোক মশাই আপনি ? সমানে আমাকে চোখ মারছেন তখন থেকে ? এই বয়েসে লজ্জা করে না' ? সুরঞ্জন গালে হাত দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ব্যাপারটা যে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এটা কিছুতেই বুঝিয়ে উঠতে পারলেন না। আশ্চর্যের বিষয় হল সুরঞ্জন চড় খাওয়ার পরও কিছুতেই চোখ ও মুখের মুভমেন্ট কন্ট্রোল করতে পারছিলেন না। সেটা দেখে যুবক স্বামীটি এগিয়ে এসে ভালো করে নিরীক্ষণ করে বললেন, 'আপনার ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক হচ্ছে খুব সম্ভবত' । তারপরেই ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের স্ত্রীকে বললেন, 'চট করে আমার প্রেসারের যন্ত্রটা নিয়ে এস তো গাড়ি থেকে'।

সদ্য বিবাহিত যুবকটি ডাক্তার হওয়ার ফলে সে যাত্রা সুরঞ্জন রক্ষা পেয়ে গেলেন বটে। অন্যথা হলে সুরঞ্জনের হেনস্থা আটকানো কঠিন হত খুব। তবে আপনি যে সর্বক্ষেত্রে হাতের সামনে একজন ডাক্তার পেয়ে যাবেন তা নয় কিন্তু। ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া কিন্তু হঠাৎ করেই হয়, প্রায় বিনা নোটিশেই। আসুন জেনে নিই এটি কি জিনিস।


ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া কি ?

মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ যদি অস্থায়ীভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয় তখনই ট্রানসিয়েন্ট ইস্কেমিক এট্যাক বা টিয়া হয়। টিয়ার উপসর্গগুলিও স্ট্রোকের উপসর্গের মতোই। তবে এটি ক্ষণস্থায়ী হয় এবং চরম ক্ষতি কিছু হয় না।সাধারণত টিয়াকে 'মিনি স্ট্রোক' বা 'ওয়ার্নিং স্ট্রোকও' বলা হয়ে থাকে। তাই একে একেবারেই হালকা ভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এর অর্থ হল ভবিষ্যতে আপনার স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। যদি আপনার টিয়া হয়ে থাকে তাহলে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে ডাক্তার দেখানোই কিন্তু বিচক্ষণতার লক্ষণ।

কোন বয়েসে হতে পারে ?
যে কোনো বয়েসেই এই এট্যাক হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এর সম্ভাবনা বেশি দেখা দেয়। পরিসংখ্যান বলছে - প্রত্যেক তৃতীয় ব্যক্তি  যাদের এই এট্যাক হয়েছে এবং চিকিৎসায় গাফিলতি করেছেন তাদের এক বছরের মধ্যেই বড় ধরণের এট্যাক হয়েছে। স্ট্রোক থেকে অর্ধেকের বেশি মৃত্যু মহিলাদের ক্ষেত্রেই ঘটে।  এছাড়াও পরিবারে কোনো সদস্যের যদি টিয়া বা স্ট্রোক হয়ে থাকে তাহলে এই এট্যাক হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

এর উপসর্গ কি ?

সাধারণত ১০ - ২০ মিনিটের বেশি এর উপসর্গগুলি থাকে না। এবং সেগুলি হল -

# বিশেষ করে শরীরের একদিকে হঠাৎ নিস্তেজতা, মৃদু কম্পন, দুর্বলতা, মুখ, হাত বা পা সঞ্চালনে সমস্যা
# দৃষ্টিশক্তিতে হঠাৎ পরিবর্তন
# কথা বলায় সমস্যা
# সহজ কথা বুঝতে বিভ্রান্তি বা সমস্যা হওয়া
# হাঁটাচলা বা ব্যালান্স করতে সমস্যা
# হঠাৎ করে কোনো কারণ ছাড়াই মাথাব্যথা হওয়া

কি করে হয় ?
সাধারণত মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার কারণেই এটা হয়। ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া, হার্ট এট্যাক বা হৃদপিণ্ডের অনিয়মিত ছন্দের কারণে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। যার ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালনে বাধা পড়ে। জমাট বাঁধার মুহূর্তের মধ্যেই মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শরীরে  উপরোক্ত উপসর্গগুলি দেখা দিতে থাকে। কখনো কখনো রক্তচাপ সাংঘাতিক হ্রাস পাওয়ার দরুনও এই এট্যাক হয়। একে 'লো ফ্লো' টিয়া বলে। তবে এই এট্যাকটি বিরল। ডাক্তাররা বলেন রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেই ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা প্রবল হয়। যার ফলে অধিকাংশ সময়েই টিয়া হতে পারে। এছাড়াও আরও কারণ আছে। দেখে নিন কি কি -

# অতিরিক্ত রক্তচাপ
# ক্যারোটিড ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধলে (গলার ধমনী যা সোজা মস্তিষ্কে পৌঁছয় )
# পেরিফেরাল ধমনীতে রক্ত জমাট বাঁধলে (হাত ও পায়ের ধমনী )
# ডায়াবেটিস
# রক্তে এমিনো এসিডের বৃদ্ধি
# অতিরিক্ত ওজন

চিকিৎসা কি ?
একজন দক্ষ নিউরোলজিস্ট বা কার্ডিওলোজিস্টের শরণাপন্ন হওয়া। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খাওয়া এবং প্রয়োজনমত সমস্ত পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া। সুবিদার্থে জানিয়ে রাখি, তিনি যে পরীক্ষাগুলি করাতে পারেন তা হল - সিটিস্ক্যান, এমআরআই, এঞ্জিওগ্রাম, ডপ্পলার আল্ট্রাসাউন্ড, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম, ব্লাড টেস্ট প্রভৃতি। তবে এতো গেল চিকিৎসকের অধীনে নিয়মমাফিক কাজ করা। আপনাকে নিজে যা যা করতে হবে তা হল -

# ধূমপান ও এলকোহল পরিত্যাগ করা
# কোলেস্টেরল ও ফ্যাট জাতীয় খাবার বর্জন করা
# প্রচুর ফল ও শাকসবজি খাওয়া
# সোডিয়াম যুক্ত বা নোনতা খাবার কম খাওয়া
# নিয়মিত শরীরচর্চা করা
# সুস্থ, স্বাভাবিক ওজন বজায় রাখা
# ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা

এই নিয়মগুলি পরপর মেনে চললে টিয়ার ঝুঁকি যে অনেকাংশেই কমে যায় তা বলাই বাহুল্য। নব বিবাহিতা তরুণী অবশ্য সুরঞ্জনের কাছে ভীষণ ভাবে ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন পরবর্তীকালে। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে যদি ঠিক এমনটি ঘটত তাহলে তো আপনি 'টিয়া টিয়া' বলে বিখ্যাত গানটা গেয়েও পার পেতেন না। এখন কথা হচ্ছে আপনি সময় থাকতে সাবধান হবেন নাকি জোর করে বিপদ ডেকে আনবেন। পুরোটাই নির্ভর করছে আপনার ওপর।  

#healtharticle #Transientischemicattack #TIA #healthnews #GenesisHospitalKolkata #asprescribed




Monday, 6 November 2017

৮০তে আসিও না


'বার্লি খেলে কি আর যৌবন ফিরে পাব' ?.......
ভানু বন্দোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত ছবির কথা মনে আছে নিশ্চই ? বার্ধক্যের অমাবস্যা ছেড়ে পুকুর ভর্তি যৌবনের পূর্ণ চন্দ্রিমার লালসায় যে কি কি অলীক কাণ্ড ঘটতে পারে তা তিনি এই ছবিতে সুচারুরূপে বুঝিয়ে গেছেন। তবে কিনা ছায়াছবির গল্পকথায় হৃদয় গলে বটে, তবে বাস্তবের ফাঁক গলে আসল প্রতিচ্ছবিটা আমাদের প্রায়শই বেদনার কারণ হয়ে ওঠে। মন চায় কিন্তু শরীর চায় না মোটে। তবে মনোহর আইচের মতো শতাব্দী জোড়া বাইসেপ্স ট্রাইসেপ্স বাগাতে না পারলেও সুস্থ শরীরটা যে একান্ত কাম্য একথা কিন্তু কায়মনোবাক্যে স্বীকার করবেন সকলে। কারণ মনের প্রজাপতি ইতিউতি উড়ে বেড়ালেও বয়সকালে হাত পা ছুঁড়ে আপনিও যে দিগ্বিদিগ ঘুরে বেড়াবেন তা আর হয়ে ওঠে কৈ ? 

আশিতে আসিলে যে কি কি সমস্যা তৈরী হয় এ আমাদের আপামর বাঙালীকুলের বিলক্ষণ জানা আছে। যেমন - ছানি, আমবাত, গেঁটে বাত, অনিদ্রা, বুক ধড়ফড়, মাড়ি কনকন, গ্যাস অম্বল তো আছেই এমনকি ভীমরতি হওয়াটাও আমরা অধিক বয়েসের রোগ বলেই ধরে থাকি। তবে এতেই ক্ষান্ত নেই, এই সমস্ত রোগের পাশাপাশি এমন আরও একটি রোগ আছে যা কিনা প্রায় বিনা কারণেই দেখা দিতে পারে। আর তা হল - প্রস্রাবে সমস্যা। হ্যাঁ, শুধু ভারতবর্ষে কেন, খুঁজলে পরে গোটা পৃথিবীতেই পঞ্চাশ বা তার বেশি বয়েসের পুরুষের প্রোস্টেটের সমস্যা পাবেন প্রায় ঘরে ঘরে। এই জনপ্রিয় রোগটির একটি গালভরা নাম আছে বটে, ডাক্তারী ভাষায় যাকে বলে বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া। আসুন দেখে নিই কিভাবে এই রোগ হয় এবং এর হাত থেকে নিস্তার পাবার উপায় কি। 

বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া কি ?
প্রস্টেট গ্রন্থির বৃদ্ধিকে বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বলে। ছোট করে একে বিপিএইচ বলা হয়।বয়স্ক পুরুষদের মধ্যেই সাধারণত এই রোগ দেখা দেয়। তিরিশ বছর বয়েস থেকে এই বিপিএইচ এর সূত্রপাত। ক্রমশ তা বাড়ে ও পঞ্চাশ বছর বয়েসের পর থেকে এই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। তবে নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন কারণ এর থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং এই রোগের কারণ ও উপসর্গগুলিতে একটু চোখ বুলিয়ে নিই। সময় থাকতে থাকতে সাবধান হওয়া যাবে অন্তত। 

এই রোগ হওয়ার কারণ 
সাধারণত এর সঠিক কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে কিছু চিকিৎসকদের মতে বয়স্ক পুরুষদের যৌন হরমোনের পরিবর্তন এর কারণ হতে পারে। এছাড়া প্রস্টেট সমস্যার পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও এই রোগ হতে পারে। জেনেসিস হসপিটালের নামকরা তরুণ ইউরোলজিস্ট ডঃ দেবাংশু সরকার বলছেন এই রোগটিকে এড়ানোর সম্যক কোনো উপায় নেই।  

ঠিক কি হয় 
প্রস্টেট গ্রন্থি বেড়ে যাবার দরুন মূত্রনালীতে চাপ পড়ে। যার ফলে প্রস্রাবের প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং এই প্রস্রাব মূত্রাশয়ে জমতে থাকে। ফলস্বরূপ দিনে ও রাতে রুগীর ঘন ঘন প্রস্রাব হতে থাকে। 

উপসর্গ 
# ঘন ঘন মূত্রত্যাগ 
# মূত্রত্যাগের সময় জ্বালা বা ব্যাথা হওয়া  
# মূত্রাশয় নিয়ন্ত্রণে সমস্যা
# অসম্পূর্ণ প্রস্রাব
# প্রস্রাব লিক হওয়া  
# প্রস্রাবে রক্তের চিহ্ন 

রোগ নির্ণয় 
চিকিৎসকরা বিভিন্ন পদ্ধতি বা রেক্টাল পরীক্ষার দ্বারা বিপিএইচ নির্ণয় করেন। যেমন - 
# ইউরিনালিসিস 
# ইউরোডায়নামিক টেস্ট 
# প্রস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন টেস্ট 
# পোস্ট ভয়েড রেসিডুয়াল 
# সিস্টোস্কপি 
# ইউরোগ্রাফি 

চিকিৎসা কি 
এই রোগের প্রাথমিক চিকিৎসাই হলো নিজের যত্ন নেওয়া ও শরীরের প্রতি খেয়াল রাখা। যেমন মদ্যপান ও ক্যাফিনের থেকে দূরে থাকুন। অযথা স্ট্রেস নেবেন না তাতে প্রস্রাবের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ে। এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম করুন, বেশ কিছুটা সুফল পাবেন। তারপরেও যদি উপসর্গ রয়ে যায় তাহলে একজন দক্ষ চিকিৎসকের বা ইউরোলজিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ খেতে হবে বা প্রয়োজনমত সার্জারি করিয়ে নিতে হবে। আর সার্জারি মানেই কিন্তু কাটাছেঁড়া নয়। বর্তমান শল্য চিকিৎসায় অত্যাধুনিক পদ্ধতির দ্বারা একেবারে সহজ সার্জারি সম্ভব হচ্ছে। যেমন ট্রান্স ইউরেথ্রা রেসেকশন অফ প্রস্টেট। এই পদ্ধতিতে পুরুষের যৌনাঙ্গের মধ্যে দিয়ে রিসেক্টোস্কোপের দ্বারা প্রস্টেটের কিছু অংশ বা বর্দ্ধিত টিস্যু বের করে নেওয়া হয়। এছাড়াও লেজার ট্রিটমেন্টের দ্বারা সফল ভাবে প্রস্টেট সার্জারি করা হয়। 

তবে ভয়ের কিছু নেই। তার কারণ আপনি একা নন। সারা পৃথিবী জুড়ে সংখ্যায় প্রায় ১০ কোটির ওপর মানুষ এই রোগে আক্রান্ত এবং আশ্চর্যের বিষয় হল আশি বছর বয়েসের ঊর্ধ্বে প্রায় ৯০ শতাংশ পুরুষেরই এই রোগ হয়। সুতরাং নিশ্চিন্তে থাকুন এবং একজন ইউরোলজিস্টের সাথে যোগাযোগ করুন। আপনার শরীর তো আপনারই দায়িত্ত্বে। তাই না ?

#urology #prostate #benignprostatichyperplasia #oldmendisease #GenesisHospitalKolkata #asprescribed